সুন্দরবনে কমেছে ৩ প্রজাতির পাখি


168 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবনে কমেছে ৩ প্রজাতির পাখি
জানুয়ারি ১৯, ২০২২ ফটো গ্যালারি সুন্দরবন
Print Friendly, PDF & Email

আকরামুল ইসলাম ::

২০০৭-২০০৮ সালের জরিপের তথ্য মতে সুন্দরবনে ৩২০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। তবে সেই সংখ্যা এখন কত তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বনের ভেতর বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও পাখি শিকারিদের অপতৎপরতাসহ নানা কারণে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকায় কমেছে পাখির সংখ্যা। 

বনজীবীরা বলছেন, সুন্দরবনে পাখির সংখ্যা কমেছে। এখানে আগের মতো পাখির কলরব দেখা যাচ্ছে না। আর বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবনে পাখি নিয়ে জরিপ প্রয়োজন। পাখি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সুন্দরবনে তিন প্রজাতির পাখি কমেছে। এর মধ্যে একটির দেখা মিলছে না অনেক বছর ধরে।

বন বিভাগের তথ্য মতে, শঙ্খচিল, গাংচিল, মদনটাক, বক, মাছরাঙা, ঈগলসহ অন্তত ৩২০ প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখর বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন। সুন্দরবনের গাছের ফল ও নদী-খালের ছোট মাছ খেয়ে টিকে থাকে এসব পাখিরা। 

কাগজে-কলমে সুন্দরবনে নানা প্রজাতির পাখি থাকার কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র এখন ভিন্ন। বন বিভাগ থেকে অনুমতিপত্র নিয়ে সুন্দরবনে বিচরণকারী বনজীবীদের দেওয়া তথ্যমতে, সুন্দরবনে আগের থেকে পাখির সংখ্যা ও প্রজাতি দুটোই কমেছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, সুন্দরবনে বৃক্ষ নিধন, বনের ভেতরে ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল, চোরা শিকারিদের অপতৎপরতা ও খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার অন্যতম। এগুলোর ফলে সুন্দরবন থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে বৈচিত্র্যময় পাখিগুলো। আর পাখি গবেষকরা বলছেন, সুন্দরবনে তিনটি প্রজাতির পাখি এখন একেবারেই কমে গেছে। একটির দেখা মিলছে না অনেক বছর ধরেই।

৩০ বছর ধরে সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরছেন সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়নের সোরা গ্রামের বনজীবী শহিদুল ইসলাম। মাছ ধরা, কাকড়া ধরা, মধু সংগ্রহ করা এসব কাজে তিনি বন বিভাগ থেকে অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন।

শহিদুল ইসলাম জানান, সুন্দরবনে আগের থেকে পাখির সংখ্যা কমে গেছে। আগে প্রচুর পাখির দেখা মিলত, পাখির ডাকে মুখর থাকত বন। তবে এখন আর খুব বেশি পাখি দেখা যায় না, ডাকও শোনা যায় না। তবে কোনো কোনো জায়গায় অনেক পাখি দেখা যায়। 

কী কারণে পাখির সংখ্যা কমতে পারে মনে করেন এমন প্রশ্নে বনজীবী শহিদুল ইসলাম বলেন, বনের মধ্যদিয়ে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার চলাচল করে। এ কারণে পাখি ওই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। ছোট ছোট খালগুলোতে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করে অনেক জেলেরা। এর ফলে ওই বিষাক্ত মাছ, পোকামাকড় ও পানি খেয়ে পাখি মারা যায়। এসব কারণে পাখির সংখ্যা কমছে।

পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের মুন্সিগঞ্জ এলাকার বনজীবী আরিজুল ইসলাম জানান, আগে বনমোরগ, মুরগির দেখা মিলত। এখন সেটি আর দেখা যায় না। মাছরাঙা, কানা কুয়ো, তিলানাগ, ঈগল, শিকরে, টুনটুনি, চিল, বক, সারস প্রজাতির পাখি বেশি দেখা যায়।

তিনি বলেন, বনের ভেতরে বক, সারস, মদনটাকসহ মাছ খেয়ে বেঁচে থাকা অনেক পাখি বিষাক্ত মাছ খেয়ে মারা যায়। যেসব খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা হয় সেসব খালের আশপাশে মরা পাখির দেখা মিলবে।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সহ-সভাপতি তারেক অণু জানান, সুন্দরবনে পাখি নিয়ে নিয়মিত জরিপ করা প্রয়োজন। সুন্দরবন একটি বৃহৎ এলাকা। এখানে অন্য জায়গার মতো দ্রুত জরিপ কার্যক্রম করা সম্ভব নয়। নৌকায় ঘুরে ঘুরে করতে হবে। আমরা নিয়মিতই সুন্দরবনে পাখি গবেষণার কাজে যায়। যখন যায় তখন মহাবিপন্ন পাখির দেখা মেলে। সুন্দরবনে মাছ ফিন ফুড নামে একটি পাখি রয়েছে। যে পাখিটা সারাবিশ্বের মধ্যে রয়েছে মাত্র ৩০০টি। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ রয়েছে সুন্দরবনে।

তিনি বলেন, এই মহাবিপন্ন পাখিটাও সুন্দরবনে হুমকির মুখে। সুন্দরবনে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, জেলেরা যখন এই পাখির বাসা দেখে তখন রাতে বাসা থেকে পাখিটাকে ধরে নিয়ে যায়। এছাড়া সুন্দরবনে কিছু কিছু পাখির সংখ্যা কমেছে। সুন্দরবনের খালে পাটাজাল দিয়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ তবুও জেলেরা ধরছে। 

বার্ড ক্লাবের সহ-সভাপতি তারেক অণু বলেন, সুন্দরবনে কোন কোন পাখি বিলুপ্ত হয়েছে সেটি বলা কঠিন। তবে তিনটি প্রজাতির পাখি কমে গেছে সুন্দরবনে। বিশেষ করে সুন্দরবনে লাল শকুন দেখা যাচ্ছে না।

সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকার জীব-বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করে বে-সরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিক। প্রতিষ্ঠানটির আঞ্চলিক কর্মকর্তা গাজী আল ইমরান জানান, সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকায় পাখির সংখ্যা গত এক দশকে আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অনেক জলজ প্রজাতির পাখি এখন আর দেখা যায় না। সুন্দরবনে কমে গেছে পাখির কলরব। শুধু সুন্দরবন নয়, উপকূলীয় এলাকাতেও পাখির সংখ্যা কমেছে। বিভিন্ন মাছের ঘের ও সরকারি খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করা হয়। এই বিষ প্রয়োগের ফলে পাখিসহ গোটা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য পড়েছে হুমকির মুখে। এছাড়া মৌসুমী পাখি শিকারিদেরও উৎপাত রয়েছে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে পাখির ওপরেও। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিষ দিয়ে মাছ শিকার, লবণাক্ততা বৃদ্ধির প্রভাবে পাখির সংখ্যা দিন দিন কমছে। খালে-বিলে বিষ টোপ ব্যবহার ও ফাঁদ পেতে ধরা হয় বক, ডাহুক, মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন কর্মকর্তা এমএ হাসান জানান, ২০০৭-২০০৮ সালে সুন্দরবনে পাখি জরিপ করা হয়েছিল সেই তথ্য মতে ৩২০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। তবে এখন কী পরিমাণ পাখির প্রজাতি রয়েছে সেটির কোনো পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। পাখি নিয়ে জরিপ করা প্রয়োজন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি করছি। 

সুন্দরবনে পাখির সংখ্যা কমছে এই প্রশ্নে তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের কোনো জরিপ করা নেই সে কারণে পাখির প্রজাতি বা সংখ্যা কমেছে কিনা সেটি বলতে পারছি না। জরিপ হওয়ার পর জানা যাবে। এছাড়া সুন্দরবনে বন্যপ্রাণীদের জন্য তিনটি অভয়াশ্রম রয়েছে। সেগুলোই পাখির অভয়াশ্রম। আলাদা করে পাখির জন্য সুন্দরবনে কোনো অভয়াশ্রম নেই। অনেক সময় দেখা যায়, যেসব অঞ্চল দিয়ে নৌযান চলাচল বা মানুষের উপস্থিতি রয়েছে সেসব এলাকায় পাখি কম থাকে। গহীন বনের ভেতরে পাখির বিচরণ ও কলরব বেশি।

পাখি রক্ষায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এই প্রশ্নে বন কর্মকর্তা এমএ হাসান বলেন, সুন্দরবনে জেলেদের বিষ দিয়ে মাছ ধরা গত দুই বছরে আমি তিনটি কেস পেয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে বন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া গণসচেতনতা বৃদ্ধিও জন্য লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকা ২৪-৫২ শতাংশ করা হয়েছে। 

বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শন আব্দুল্লাহ আস সাদিক জানান, পাখি শিকার করলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে দুই বছর কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই ব্যক্তি আবারও অপরাধ করলে দণ্ড দ্বিগুণ হবে। সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে পাথি শিকার রোধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পাখি শিকার বন্ধে ইতোমধ্যে এয়ারগানের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বার্ড ক্লাব, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি সংগঠন সুন্দরবন ও উপকূলের জলজ পাখি নিয়ে শুমারি কার্যক্রম শুরু করেছে। জরিপ কার্যক্রম শেষ হলেই প্রকৃত চিত্র জানা যাবে।