সুন্দরবনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১৮ বনদস্যু বাহিনী : আতংকে জেলে-বাওয়ালীরা


310 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১৮ বনদস্যু বাহিনী : আতংকে জেলে-বাওয়ালীরা
নভেম্বর ১৪, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

মনজুর কাদীর / আশরাফুল আলম :
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’ সুন্দরবন। আয়তন দশ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটারের মালিকানা বাংলাদেশের। বাকী প্রায় ৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার শাসন করে ভারত।বিশালায়তন এই বনভূমির প্রায় অর্ধেকটা পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতায়। সুন্দরবনে যাতায়াতকারী বনজীবী জনগোষ্ঠীকে সেখানকার ভয়ঙ্কর সব প্রাণিকে যেমন পরাস্ত করতে হয়, তেমনি মোকাবেলা করতে হয় সুন্দরবনের স্বঘোষিত মহাজন রূপী  জলদস্যু ও বনদস্যুকে। বর্তমানে বাংলাদেশ-ভরত মিলে ৩৫ টির উর্দ্ধে ছোট-বড় দস্যুবাহিনী  দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা সুন্দরবন। তাদের কাছে রয়েছে আধুনিক দেশী-বিদেশী অস্ত্র ও গুলাবারুদ।এসব অস্ত্রের ভয়ে সন্ত্রস্ত বনজীবীরা। গোটা সুন্দরবন জুড়ে চলছে এসব বনদস্যুদের শাসন।

গত ১২ নভেম্বর সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে  পর্যটন বর্ষ-২০১৬ উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী কমরেড রাশেদ খান মেনন। সভায় শ্যামনগর আসনের সংসদ সদস্য এস এম জগলুল হায়দার তার বক্তব্যে বলেন, সুন্দরবনে বনদস্যুদের সীমাহীন অত্যাচার,নির্যাতন শুরু হয়েছে। বনদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানিয়ে এমপি জগলুল হায়দার বলেন, সুন্দরবনে পর্যটকদের আকর্ষন করতে হলে যে কোনমূল্যে বনদস্যু বা জলদস্যুদের দমন করতে হবে। কারণ, অস্ত্রধারী জলদস্যুদের প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলে পর্যটকরা সেখানে যেতে সাহস পাবে না।

সম্প্রতি শ্যামনগরে অনুষ্ঠিত ওপেন হাউজ ডে’তে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার চৌধুরি মঞ্জুরুল কবীর সুন্দবনের বনদস্যুদের দমনসহ সুন্দরবন রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষনা দেয়ায় বনজীবীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা এ ঘোষণা শুধু কথাই শেষ নয়, বাস্তবায়ন দেখতে চান।

সুন্দরবনের বনদস্যুদের রুখতে র‌্যাব, কোষ্টগার্ড একের পর এক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি র‌্যাব পর পর কয়েকটি বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমান অস্ত্র উদ্ধার করেছে। কয়েক জন শীর্ষ বনদস্যু র‌্যাবের সাথে ক্রসফায়ারে হতাহত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে জেলে-বাওয়ালীদের মধ্যে আশার আলো জেগেছে। তবে বনদস্যুদের অত্যাচার কিন্তু থেমে নেই। ১৮ বনদস্যু বাহিনী এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

জানাগেছে, দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সাত লাখ পরিবার জীবন-জীবিকা সুন্দরবনকে ঘিরে। শুধু সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতায় প্রায় তিন লাখের কাছাকাছি মানুষ প্রতিনিয়ত সুন্দরবনে যাতায়াত করে।  বর্তমানে ছোট-বড় প্রায় ৩০ বাহিনীর হাতে জিম্মি সাধারন বনজীবিরা। এদের কেউ দস্যুদের কবল থেকে রেহাই পায় না। তারা বনজীবিদের অস্ত্রেরমুখে জিম্মি করে প্রতিমাসে আদায় করছে কোটি কোটি টাকা। সমকালের অনুসদ্ধানে (জেলে-বাওয়ালী ও বন বিভাগ সূত্রে)এসব বনদস্যুদের নাম, পরিচয়,অবস্থান,সংখ্যা এবং তাদের অস্ত্র ও গুলাবারুদের চিত্র উঠে এসেছে।

 

images„
জাহাঙ্গীর, ইলিয়াস ও রফিক বাহিনী (রাজু বাহিনী নামে পরিচিত) : এক সময় গোটা সুন্দরবনকে তিনভাগে ভাগ করে শাসন করত তিন বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রস ফায়ারে পড়ে বিলুপ্ত প্রায় প্রধান দুটি বাহিনী। এদের মধ্যে কেবল ভারতে পালিয়ে প্রানে বেঁচে আছেন রাজু বাহিনীর প্রধান রাজু। বর্তমানে এই বাহিনীটি পরিচালনা করছেন রাজুর শিষ্য ইলিয়াস, জাহাঙ্গীর আর রফিক। ভারত থেকেই সরাসরি বাহিনীর কাজ তদারকিতে করেন রাজু নিজেই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে এ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৫০ জন। ৪৩ টি অটো রাইফেল এবং ফোর সিলিন্ডার দুইটি হাইস্পিড স্পিডবোট রয়েছে তাদের।

আমিনুর বাহিনী : বাহিনী প্রধান আমিনুরের বাড়ি শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালীনি গ্রামে। শুরুতে রাজু ও জয়নাল বাহিনীর টাকা সংগ্রহকারী হিসেবে কাজ করা আমিনুর পরবর্তীতে ২০-২২ জনকে সাথে নিয়ে নিজেই একটি বাহিনী গড়ে তোলে। ১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এই বাহিনী তৎপর পশ্চিম সুন্দরবনের গোটা সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায়। তবে পুলিশের হাতে আটক হয়ে আমিনুর বর্তমানে কারারুদ্ধ থাকলেও তার পক্ষে তার এক ভাগ্নে লোকজন ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জিম্মি ও অপহরণ করা, মুক্তিপণ আদায়সহ দস্যুতা অব্যাহত রেখেছে।

জোনাব বাহিনী : শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর এলাকার জোনাব আলীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জোনাব বাহিনীর ১২ সদস্যের হাতে রয়েছে দুটি স্বক্রিয় অস্ত্রের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন মডেলের ৮টি আগ্নেয়াস্ত্র। এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫ জন।

খোকাবাবু বাহিনী : শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখা গ্রামের খোকা বাবু এক সময় আমিনুর বাহিনীর হয়ে কাজ করত।পরবর্তীতে ৯/১০ জনের একটি দল ও এইট শুটার ও নাইন শুটার গান আছে এদের হাতে। প্রায় সব মিলিয়ে ১২ হাজার রাউন্ড গুলি তাদের কাছে মজুদ রয়েছে বলে জানাগেছে। সুন্দরবনের সবচেয়ে সংগঠিত এ বাহিনীর হাতে আছে সাতটি আধুনিক অস্ত্র।

রাঙা বাহিনী : এক সময় খোকা বাবু বাহিনীর পক্ষে টাকা আদায়ের দায়িত্ব পালন করলেও গত দু’তিন বছর পূর্বে তৎপর হয়েছে রাঙা বাহিনীর সদস্যরা। তার দলের ৭-৮ জনের কাছে ৫টি দেশীয় অস্ত্র রয়েছে বলে জেলেদের সূত্রে জানা গেছে।

রবিউল বাহিনী : পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় রবিউল বাহিনী নামের দুটি গ্রুপের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। একটি গ্রুপ খুলনার কয়রা উপজেলার রবিউল ইসলামের নের্তৃত্বে রবিউল বাহিনী নামে পরিচিত। অপরটি শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি গ্রামের রবিউল গ্রুপ নামে জেলেদের কাছে পরিচিত। জানা গেছে, কয়রার রবিউলের নেতৃত্বে ১২-১৩ জন সদস্যের এই দলের হাতে ১০টি দেশীয় অস্ত্র রয়েছে। কালিঞ্চির রবিউল বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৭-৮ জন। তাদের হাতে রয়েছে বেশ কয়েকটি দেশী অস্ত্র।

লাল্টু বাহিনী : ইতিপূর্বে হরিণ শিকার ও জয়নাল বাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে স্থানীয় কিছু লোকজন নিয়ে লান্টুর নামে একটি বাহিনী সুন্দরবনে তৎপর। জানাগেছে, কয়েক মাস আগে ১০-১২ টি অস্ত্র খোয়া গেছে এই বাহিনীর। বর্তমানে ৭-৮টি অস্ত্র রয়েছে তাদের হাতে। পুলিশি অভিযানে বাবলু নামের এক অবসরপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্য এই বাহিনীর হয়ে দস্যুতা করতে যেয়ে অস্ত্রসহ আটক হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করছে।

রেজা বাহিনী : কালিঞ্চি গ্রামের রেজা বাহিনীর প্রধান রেজা শুরুতে লাল্টু বাহিনীর সাথে কাজ করলেও বছর দু’য়েক আগে থেকে ৫-৬ সদস্যকে নিয়ে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলে। মূলত নির্দিষ্ট নম্বরের অনুকুলে বিকাশ ও তার দু’ভাই মূক্তিপণের টাকা আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফরহাদ বাহিনী : রামপাল উপজেলার এই দুর্ধর্ষ বনদস্যুর গ্রুপে বর্তমানে ১৩-১৪ সদস্য কর্মরত। ১১ টি স্বক্রিয় অস্ত্রের মালিক এই ফরহাদ বাহিনী।
আনারুল-মোস্তাক বাহিনী : কয়রা উপজেলার আনারুল মোস্তাক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১৫-১৬ জন। ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৫ হাজার রাউন্ড গুলাবারুদ তাদের হাতে রয়েছে বলে তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে।

আলিফ ওরফে আলিম বাহিনী : শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালীনি গ্রামের এই দুর্ধর্ষ বনদস্যু গ্রুপটি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী। তাদের হাতে ৩২টি দেশ-িবিদেশী অস্ত্র রয়েছে। এদের মোট সদস্য সংখ্যা ৩৬ জনেরও বেশি। ভারতের সীমান্ত এলাকার সুন্দরবন এলাকায়ও এ বাহিনীর অবাধ বিচারণ রয়েছে। আলিম বাহিনীর পক্ষে মুক্তিপনের টাকা আদায়ের দায়িত্ব পালন করে শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জের সিরাজুল ইসলাম নামের তাদের এক সদস্য বলে জানাগেছে।

জিয়া বাহিনী : খুলনার পাইকগাছা এলাকার এই বনদস্যুর নেতৃত্বে ১২ সদস্যের দলটি জিয়া বাহিনী নামে পরিচিত। ৮টি অস্ত্র নিয়ে পরিচালিত এই বাহিনী।

হজরত বাহিনী : গত মে মাসের শুরুতে বনদস্যু আকবর আলীর হাতে রহমারের মৃত্যুর পর ৭ সদস্যের বাহিনীটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে হজরত গাইন। এই বাহিনীর হাতে ৫টি অস্ত্র রয়েছে রয়েছে বলে বনজীবীরা জানিয়েছে।

মজিদ-ইউনুস বাহিনী : সম্পর্কে পিতা-পুত্র মজিদ ও ইউনুস। আপাতত তারা ৪টি অস্ত্র নিয়ে সুন্দরবনে তৎপর। মজিদের ছেলে ইউনুস নিজ বাহিনীর টাকা আদায়ের পাশাপাশি লাল্টু জাহাঙ্গীর ও রবিউল বাহিনীর পক্ষে মুক্তিপণ বা চাঁদার টাকা আদায় করে।

সুন্দরবনে বাংলাদেশী বনদস্যুদের পাশাপাশি ভারতীয় আকাশ বাহিনী,বিমল,তারক,কাকা ও সুকুমার বাহিনী নামের আরও ৫টি শক্তিশালী বাহিনীর উপস্থিতি সাতক্ষীরা রেঞ্জের মাঝে মধ্যে টের পাওয়া যায় বলে জেলা-বাওয়ারীদের দাবি। ৩২-৩৩ সদস্যের এই পাঁচ বাহিনীর হাতে ২৭টি অস্ত্র রয়েছে। সম্প্রতি শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম বিপ্লবের  নেতৃত্বে কোষ্ট গার্ড  কয়েকটি  বনদস্যু বাহিনীর সদস্যদেরকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেফতার ও পুলিশের যৌথ অভিযানে সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাতদল আটক সহ বেশকিছু অপহৃত জেলে ও জেলে নৌকা উদ্ধার করেছেন। এতে করে সুন্দরবনের উপর নীর্ভরশীল কিছু জেলে ও বাওয়ালীরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন বলে তারা জানান।

শ্যামনগর থানার ওসি ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, সুন্দরবনের বনদস্যু দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। সম্প্রতি সুন্দরবনের খুলনা ও বাগেরহাট রেঞ্জে অর্ধশতাধিক বনদস্যু বাহিনীর সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ও আহত হয়েছে। বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অবিযান অব্যাহ থাকবে।

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের (এসিএফ) রেঞ্জ কর্মকর্তা ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে বলেন, জেলে ও বাওয়ালীরা ভয়ে বনদস্যুদের অবস্থান সম্পর্কে বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে কিছুই বলতে রাজি হননা।তারা গোপনে মুক্তিপন ও চাঁদার টাকা দিয়ে বনদস্যুদের সাথে মিলেমিশে থাকতে চায়। তবে বনদস্যু দমনে বনবিভাগ, কোষ্টগার্ড, বিজিবি ও পুলিশ তৎপর রয়েছে বলে তার দাবী।