সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়লেও কমছে না হুমকি


253 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়লেও কমছে না হুমকি
জুলাই ২৯, ২০১৯ ফটো গ্যালারি সুন্দরবন
Print Friendly, PDF & Email

বিশ্ব বাঘ দিবস আজ

অনলাইন ডেস্ক ::

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়লেও কমছে না উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো বিভিন্ন হুমকি। বরং মানুষের আগ্রাসন ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে সেগুলো বেড়ে চলেছে। বন্ধ হয়নি বাঘ শিকার ও পিটিয়ে হত্যা। খাদ্য সংকট, গাছ কাটা, নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন, শিল্পকারখানা ও জলযানের দূষণের পাশাপাশি অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতি হচ্ছে বাঘের। তাই এসব হুমকি নিয়ে উদ্বিগ্ন বন বিভাগ ও সংশ্নিষ্টরা। এই পরিস্থিতিতেই আজ পালিত হবে বিশ্ব বাঘ দিবস।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত দুই দশকে বিভিন্ন কারণে মারা গেছে সুন্দরবনের ৪৩টি বাঘ। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত গণপিটুনিতে মারা গেছে লোকালয়ে আসা ১৪টি বাঘ। চোরা শিকারিদের হাতে মারা পড়েছে আটটি। চামড়া উদ্ধার হয়েছে ১০টি বাঘের। এ ছাড়া বার্ধক্যজনিত কারণে আটটি, অসুস্থতায় দুটি ও ঘূর্ণিঝড় সিডরে মারা গেছে সুন্দরবনের একটি বাঘ।

২০১৫ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে করা শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘ ছিল ১০৬টি। আর ২০১৮ সালের সবশেষ শুমারি অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪টিতে। এমন প্রেক্ষাপটে আজ সারাদেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস।

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, গণপিটুনিতে বাঘ হত্যা এবং বাঘ শিকার- এ দুটিই বাঘের জন্য খুব বড় হুমকি। বাঘ হত্যা বর্তমানে খানিকটা কমলেও বন্ধ হয়নি পুরোপুরি। বনের গাছপালা কাটা হচ্ছে। পর্যটকরা অবাধে বাঘের অভয়ারণ্যে ঢুকে পড়ছেন। পর্যটকদের আনন্দ আয়োজনে বনে শব্দদূষণ বাড়ছে। যা বিরূপ প্রভাব ফেলছে বাঘের ওপর। তিনি বলেন, বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার করা হচ্ছে। এতে বাঘের খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. আবদুলল্গাহ হারুন চৌধুরী বলেন, বনের পাশে সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ অসংখ্য শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার তরল বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। জাহাজ চলাচলও বাড়ছে। জাহাজগুলোর বর্জ্য তেলও বনের পানি এবং মাটিতে দূষণ ঘটাচ্ছে। এসব দূষণে ক্ষতি হচ্ছে বাঘের। তিনি বলেন, বাঘের প্রধান চাহিদা হরিণ ও শূকরের সংখ্যাও কমে আসছে। ফলে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মিষ্টি পানির অভাবও বাঘকে অসুস্থ করে তুলছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল আজিজের সাম্প্রতিক গবেষণা ‘সুন্দরবনের বাঘের জিনগত কাঠামো কি নদীর মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে?’ থেকে জানা যাচ্ছে, বাঘের জিনগত কাঠামোর ওপর সুন্দরবনের পাঁচটি প্রশস্ত নদীর প্রভাব রয়েছে। পশুর, শিবসা, রায়মঙ্গল, হাড়িয়াভাঙ্গা ও আড়পাঙ্গাসিয়া নদী- সুন্দরবনের মধ্যে প্রবাহিত এ পাঁচটি নদী বাঘকে জিনগতভাবে আলাদা করে ফেলছে। নদীগুলো দেড় থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার প্রশস্ত হওয়ায় বাঘ সহজে পারাপার হতে পারে না। ফলে বাঘ নির্দিষ্ট কিছু স্থানে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে এবং প্রজননের মাধ্যমে জিনের আদান-প্রদানও ব্যাহত হচ্ছে। পর্যটক ও পণ্যবাহী নৌযানের কারণে বাঘের চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বাঘের প্রজনন সম্পর্কও বিঘ্নিত হচ্ছে। জিনগতভাবে এ প্রাণীটি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এ ব্যাপারে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মদিনুল আহসান বলেন, ২০১৮ সাল থেকে ১০ বছরের জন্য টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়। এর আওতায় বাঘের হুমকিগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করতে এবং বাঘের সংখ্যা আরও বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে আবারও বাঘশুমারি হবে।

খুলনা সার্কেলের বিদায়ী বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী শিকার প্রতিরোধে সুন্দরবনে দুই বছর ধরে জিপিএস সিস্টেমের সাহায্যে ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’ চলছে। বন বিভাগ, পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে বাঘ শিকার প্রতিরোধে কাজ করছে।

তিনি বলেন, অসুস্থ বাঘকে সেবা দিতে খুলনায় ‘ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার’ রয়েছে। এ ছাড়া লোকালয়ে আসা বাঘ রক্ষায় সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে ৪৯টি ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। বনের গাছ কাটা ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধেও অভিযান চালানো হচ্ছে।