সুন্দরবনে বাঘ রক্ষায় প্রয়োজন দস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান


415 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবনে বাঘ রক্ষায় প্রয়োজন দস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান
সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

এস.এম সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে :
বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন । সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিশ্ব বিখ্যাত। কিন্তু সেই বাঘ নিধন চলছে নিবিচারে। বাঘ শিকারীরা বেশ তৎপর। কয়েক বছর আগে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩৬০টি । কিন্তু বাঘ শিকারীদের কারণে সেই সংখ্যা কমতে কমতে বর্তমানে ১০৬টিতে পরিণত হয়েছে।

সচেতন মহল মনে করছেন, মৃত্যুর মিছিল হতে বাঘকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বাঘের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব। ভারত ইতিমধ্যে তাঁদের দেশে বাঘের সংখ্যা অন্তত ৩০ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের সুন্দরবনেও তা’ সম্ভব হতে পারে যদি কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা  যায়।
সূত্র জানায়, সুন্দরবনে বাঘের প্রধান শক্রু চোরা শিকারী। দীর্ঘদিনের অপ্রতিরোধ্য এবং নির্বিঘ্ন তৎপরতায় চোরা শিকারীরা সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নিয়ে এসেছে। এতে বাঘের অভয়ারণ্য বনদস্যু এবং বাঘদস্যুদের বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে সুন্দরবনে বন্যপশুদের রাজ্যে দস্যুদের আধিপত্যে বাঘের হ্যাবিটেট বা বসবাসের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।সূত্র বলছে, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়াতে হলে স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী দুই ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বাঘ দস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ। বনে টহল বাড়ানো। বিদ্যমান আইনী ব্যবস্থাপনার সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করা।সূত্র মতে, স্বল্পমেয়াদী কর্মসূচির মধ্যে আরো যেকাজগুলো করা উচিত তা’ হলোঃ বাঘের জন্য নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে হবে। কোনোভাবেই সুন্দরবনে বাঘের আবাসস্থলে হস্তক্ষেপ করা চলবে না।

বাঘের বিচরণ এবং স্বাভাবিক জীবনাচার পরিচালনায় প্রকৃতি প্রদত্ত পরিবেশের কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। বনে বাঘের বিচরণপ্রাধান্য এলাকায় মানুষের প্রবেশাধিকার একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে। মানুষের ছায়াও যাতে বনে না পড়ে সে ব্যবস্থা করতে হবে।আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে সূত্র সেগুলো হলো- বননির্ভরশীলদের বনে প্রবেশে নিরুৎসাহিত করা, অন্য পেশায় অন্তর্ভুক্তির জন্য উৎসাহিত করা, বন রক্ষী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকদের এ বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় সুন্দরবনে বাঘের হ্যাবিটেটের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বাঘের খাদ্য-শৃঙ্খলে যাতে প্রভাব না পড়ে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।বনে বাঘের প্রাকৃতিক খাদ্যের প্রাচুর্যতা যাতে সৃষ্টি হয় সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বাঘের প্রিয় খাদ্য হরিণ, শুকর ইত্যাদির সংখ্যা ভারসাম্য অবস্থায় নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনে হরিণ ও শুকর গণনার মাধ্যমে খাদ্য-শৃঙ্খলের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

বাঘের প্রজনন ক্ষেত্রের উন্নয়ন করতে হবে। প্রজনন সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।এ জন্য সুন্দরবনের মধ্যে কিছু অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধারও ব্যবস্থা করতে হবে যেমন মিষ্টি পানির পুকুর ইতাদি। বাঘের বর্তমান সংখ্যা (১০৬টি) আগামী ১০ বছরের মধ্যে যাতে দ্বিগুণ করা যায় সে রকম একটি টার্গেটভিত্তিক এ্যাকশন প¬ান প্রণয়ন করে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে হবে। এ জন্য বিজ্ঞানসম্মত উদ্যোগ আয়োজন করতে হবে।এদিকে চোরা শিকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বিশ্বে সবচেয়ে বেশী বাঘের গর্বিত মালিক ভারত বাঘের সংখ্যা ৩০ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। তাঁরা সাফল্য পেয়েছে মাত্র চার বছর সময়ের মধ্যে। এটি বিপন্ন প্রাণী রক্ষায় তাঁদের একটি খুব বড় সাফল্য বলে উলে¬খ করেছে ভারতের পরিবেশ মন্ত্রী।২০১০ সালে ভারতে বাঘের পরিসংখ্যানে যেখানে বাঘের সংখ্যা ছিলো ১৭০৬, সেখানে ২০১৪ সালের গণনায় বাঘের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২২২৬টি।  ভারতের সুন্দরবন এবং উত্তরের আসাম হতে শুরু করে পশ্চিমের রাজস্থান পর্যন্ত বাঘের আবাসস্থানগুলোতে ৯৭০০ গোপন ক্যামেরা মাধ্যমে এই গণনা করা হয়।

চোরা শিকারী, পাচারকারী এবং প্রাকৃতিক বিচরণ ক্ষেত্র ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঘের এই সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে ভারতীয় সূত্রের অভিমত। ভারতীয় ৪০টি টাইগার রিজার্ভার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটিয়ে চার বছরে এই সাফল্য পাওয়া গেছে। ভারত স্বাধীনতাকালীন সময় ১৯৪৭ সালে ভারতে বাঘের সংখ্যা ছিলো ৪০ হাজার। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের সদিচ্ছা আর কর্মপ্রচেষ্টার সমন্বয় হলে সুন্দরবন হতে পারে বিশ্ব পর্যটন শিল্পের একটি। এতে একদিকে সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার হবে, অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে।
বিশ্বের অন্যতম নয়নাভিরাম এবং অপরূপ সৌন্দর্য্যরে প্রতীক সুন্দরবন। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এ অভায়রন্য বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ভূ-খন্ড জুড়ে বিস্তৃত। ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবন বাংলাদেশের উপকূলীয় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। যা দেশের মোট আয়তনের ৪.২ শতাংশ এবং মোট বনাঞ্চলের ৪৪ শতাংশ।

গাছ-পালা, পশু-পাখি, সরীসৃপ, মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যতা ও নদ-নদীতে বিস্তৃত সুন্দরবন। সুন্দরবনের বনভূমি ও জলরাশিতে রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর এ বনের গহীন অরণ্যে রয়েছে সুন্দরী ও গোলপাতা গাছের সারি। এছাড়াও রয়েছে গেওয়া, কেওড়া, বাইন, পশুর, গরান, আমুড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ। গভীর অরণ্যে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মায়াবী চিত্রা হরিণ, বানর, বণ্য শুকুর, সজারুসহ প্রায় ৪২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। ময়না, টিয়া, শ্যামা, দোয়েল, ঘুঘুসহ হাজারো পাখির বসবাস। ২ লাখ হেক্টর নদ-নদীতে রয়েছে টেংরা, পারশে, ভেটকি, টোনা, পোয়া, টাটকিনি, বাঁশপাতা, ছুরি, লটিয়া, লক্কাসহ ১২০ প্রজাতির মাছ। রয়েছে কুমির, হাঙ্গর, অজগর, ব্যাঙ, গুইসাপসহ ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ। সুন্দরবন শুধু জীব বৈচিত্র্যের উৎস নয় বন্যপ্রাণী নদ-নদী ও জলজ মৎস্যের অবাধ বিচরণ বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য  উপভোগ করার জন্য দেশী-বিদেশী অসংখ্য পর্যটক সুন্দরবনে আসেন। এক সময় সুন্দরবন মানুষের কাছে ভয়ংকর মনে হলেও গত কয়েক বছরে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের বিচরণ কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ বা সংগ্রহ করে উপকূলীয় অঞ্চলের ১০ লাখ পেশাজীবি জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত, অবকাঠামো নির্মাণসহ সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হলে উপকূলীয় ৩ জেলার লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।