সুন্দরবন অঞ্চলে কাঁকড়া শিকারী জেলে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দুর্দিনে


209 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবন অঞ্চলে কাঁকড়া শিকারী জেলে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দুর্দিনে
এপ্রিল ১০, ২০২০ ফটো গ্যালারি সুন্দরবন
Print Friendly, PDF & Email

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা ॥
করেনার প্রভাবে সুন্দরবন তীরবর্তী শ্যামনগর উপজেলায় বসবাসরত কাঁকড়া শিকারী জেলে পরিবারগুলো চরম দুরাবস্থার মধ্যে পড়েছে। আকস্মিকভাবে কাঁকড়া রপ্তানী বন্ধ হওয়ায় কর্মসংস্থানশুন্য এ এলাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে তারা। গত এক মাসে সরকারি বেসরকারি কোন ত্রাণ সহায়তা না মেলায় উপকুলীয় এ জনপদের হাজারও কাঁকড়া শিকারী জেলে পরিবার এখন অর্ধ্বাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।

এছাড়া কেনাবেঁচা বন্ধ হওয়ায় জেলেদের মত স্থানীয় ক্ষুদ্র কাঁকড়ার ব্যবসায়ীরাও পড়েছে চরম বিপাকে। রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা অনাদায়ী বকেয়া আর দাদন দেয়া জেলেদের থেকে কাঁকড়া নিতে না পারার ঘটনায় তারা ভুগছে চরম অর্থ কষ্টে ।

এমন চিত্র ফুঁটে উঠেছে পশ্চিম সুন্দরবন সংলগ্ন কদমতলা, সাধুপাড়া, দাতিনাখালী গোলাখালী, কালিঞ্চিসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং কাঁকড়া শিকারী জেলে (লেইয়ে) ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সাথে কথোপকথনে।

বিপদগ্রস্থ এসব জেলে পরিবারের অভিযোগ আইলার পর থেকে কর্মস্থানশুন্য হয়ে পড়া উপকুলীয় এ জনপদের প্রায় সাত হাজার পরিবার কাঁকড়া শিল্পের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত বছর তকে শুরু হওয়া একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আর দুর্যোগ তাদের দুর্দশাকে অসহনীয় করে তুলেছে।

সরেজমিন পরির্দশনকালে সুন্দরবন অঞ্চলের কাঁকড়া শিকার ও বিক্রির সাথে জড়িতদের সাথে কথা বলে জানা যায়, করোনার প্রভাবে তাদের জীবন থমকে গেছে। সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ভরা মৌসুমেও কাঁকড়া শিকার করতে না পারায় কর্মশুন্য উপকুলীয় এলাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে তারা অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছে। কাঁকড়া কেনাবেঁচা বন্ধের এ প্রভাব দীর্ঘদিন টানতে হবে বলেও শংকা তাদের।

হরিনগর গ্রামের বিধবা শুক্কুরী মন্ডল জানায়, জায়গা জমি না থাকায় চার সন্তানকে নিয়ে সুন্দরবন থেকে শিকার করা কাঁকড়ার উপর তাদের পাঁচ জনের সংসার চলে। কিন্তু হঠাৎ ব্যবসায়ীরা কাঁকড়া ক্রয় বন্ধ করে দেয়ায় দুই সপ্তাহ ধরে আয় রোজগার হচ্ছে না। চেষ্টা করেও মানুষের বাড়িতে কাজের ব্যবস্থা করতে না পেরে শুধু রাতে ঘুমানোর আগে একবার পানি ভাত খেয়ে দিন কাটাচ্ছে।

কদমতলার শাহানাজ ও গোলাখালীর বাবু সরদার জানায় দুই সপ্তাহ ধরে রোজগার নেই। মহাজনের নিকট থেকে নেয়া অগ্রীম টাকা শেষ। সরকারি বেসরকারি কোন সাহায্য নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। বাধ্য হয়ে এক পেটা আধ পেটা খেয়ে কোন রকমে দিন পার হাচ্ছে তাদের।

তবে এমন অসহায়ত্বের আর্তি কেবল শুক্কুরী, শাহানাজ বা বাবুর ক্ষেত্রে নয়। বরং সুন্দরবন তীরবর্তী শ্যামনগরের কদমতলার জেহের আলী, মীরগাং এর আনারুল, আজিজুল ও সরদার গ্যারেজের আবু তাহেরসহ অসংখ্য কাঁকড়া জেলের।

তাদের মত আরও অনেকের দাবি ধার দেনা আর ঋণের টাকা আগেই শেষ হয়েছে। বাধ্য হয়ে চেয়ারম্যান/মেম্বরের কাছে সাহায্যও চেয়েছে অনেকে। কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজন যৎসামান্য কিছু সহায়তা পেলেও অধিকাংশ পরিবার নিদারুন কষ্টে দিনাতিপাত করছে। বিশেষ করে শিশুসহ বয়স্ক মানুষগুলো চরম খাবার কষ্ট ভোগ করছে বলে জানান তারা। তীব্র এ অর্থ কষ্টের মধ্যে মাছ শিকারের জাল দড়া ক্রয়ের মত সক্ষমতা না থাকায় তারা মাছ শিকারে যেতে পারছে না বলেও দাবি করেন।

সুন্দরবন তীরবর্তী এলাকার এসব জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায় গত বছরের প্রায় সাত মাস নানা কারনে কাঁকড়া শিকার নিষিদ্ধ থাকায় তারা বনে যেতে পারেনি। চলতি বছরের জানুয়ারী ফেব্রুয়ারীর দু’মাস প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে মার্চের শুরুতে তারা বনে নামতেই কাঁকড়ার প্রধান বাজার চীন রপ্তানী স্থগিত করে। এসময় ব্যবসায়ীরা তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর ও মালেয়শিয়াতে রপ্তানীর সুযোগ নিয়ে স্বল্প মুল্যে কাঁকড়া কিনলেও তৃতীয় সপ্তাহ থেকে কাঁকড়া ক্রয় সম্পুর্ন বন্ধ করে দেয়। যার ফলে প্রান্তীক জেলেরা চরম দুরাবস্থার মধ্যে পড়েছে।

এদিকে কাঁকড়া শিকার ও কেনা বেঁচা বন্ধে জেলেদের পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মারাত্বক সংকটে পড়েছেন বলে দাবি করেছে। তারা জানায় কাঁকড়া নেয়ার জন্য লেইয়ে (কাঁকড়া শিকারী জেলে) দের অগ্রীম টাকা দেয়া ছিল। মার্চ এপ্রিলে কাঁকড়া ধরে পুরো টাকা উঠিয়ে দেয়ার কথা তাদের। কিন্তু রপ্তানী বন্ধ থাকায় জেলেরা কাঁকড়া দিলেও তারা নিতে না পারার পাশাপাশি রপ্তানীকারকদের নিকট তাদের সরবরাহকৃত চালানের টাকা আটকে গেছে। এমতাবস্থায় নিযুক্ত কর্মচারীদের বেতন দিতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

নিজেরা চরম অর্থ সংকটে ভুগছে দাবি করে হরিনগর বাজারের কাঁকড়া ব্যবসায়ী তাপস কুমার মন্ডল বলেন, ব্যবসা বন্ধ হওয়ায় সংসারের খরচ যোগাতে পাশের চুনকুড়ি নদীতে বড়শী দিয়ে মাছ শিকার করছে অনেকে।

বাবলুর রহমান ও জাহাঙ্গীর গাজী নামের দুই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দাবি প্রায় ছয় মাস পুর্বে থেকে তারা মার্চ মাসকে ‘টার্গেট’ করে ব্যবসায় নেমেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে করোনার কারনে রপ্তানী বন্ধ হওয়ায় পুঁজি হারিয়ে তারা রীতিমত পথে বসে গেছে। এলাকায় কাজ কর্ম না থাকার দরুন আরও অনেকের মত তারাও রোজগারের কোন ব্যবস্থা করতে না পেরে পরিবারের সদস্যদের সাথে আধপেটা খেয়ে দিন পার করছে।

উল্লেখ্য সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন অংশের জেলেরা হরিনগর, কলবাড়ী, নওয়াবেঁকী ও ভেটখালী মোকামের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ টন কাঁকড়া শিকার সরবরাহ করে। শিকারকৃত কাঁকড়া বিক্রি করে পরিবারগুলো সুস্থভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে দিনাতিপাত করতে সক্ষম হলেও করোনার প্রভাবে মার্চ থেকে রপ্তানী বন্ধ হওয়ায় তাদের জীবনে চরম দুর্দিন নেমে এসেছে।

এবিষয়ে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তুষার মজুমদার জানান, কাঁকড়া রপ্তানী বন্ধ থাকায় কাঁকড়া শিল্পের সাথে জড়িত জেলে ব্যবসায়ীসহ শ্রমিকরা চরমভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে। সফট সেল কাঁকড়া মারা যাওয়ার কারনে স্থানীয় শিল্প মালিকরা সফট সেল কাঁকড়া ক্রয় বন্ধ করে দেয়ায় জেলেদের দুরাবস্থা আরও প্রকট হয়েছে। ইতিমধ্যে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ করোনার প্রভাবে কাঁকড়া শিল্পের সাথে ক্ষতিগ্রস্থদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে।
#