সুন্দরবন সংলগ্ন খোলপেটুয়া নদী থেকে বালু উত্তোলন, হুমকির মুখে উপকূলীয় জনপদ


169 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবন সংলগ্ন খোলপেটুয়া নদী থেকে বালু উত্তোলন, হুমকির মুখে উপকূলীয় জনপদ
জুলাই ২০, ২০২০ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

॥ সামিউল মনির ॥

পশ্চিম সুন্দরবনের পাশ দিয়ে প্রবাহিত খোলপেটুয়া নদীর ভাঙন প্রবণ পশ্চিম পাতাখালী ও ঝাঁপা এলাকা থেকে ড্রেজার মেশিনের সহায়তায় বোরিং করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিশালাকারের দুটি কার্গো নোঙর করে একাধিক ড্রেজার মেশিন স্থাপনপুর্বক সেখান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলনের এ মহোৎসব চলছে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে।
উত্তোলনের পর বালু নৌকাযোগে শুরুতে খোলপেটুয়া ও পরে মালঞ্চ নদী হয়ে পশ্চিম পাতাখালী এলাকা থেকে উত্তোলনকৃত সমুদয় বালু বুড়িগোয়ালীনির দাতিনখালী এলাকায় নিয়ে স্তুপ করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দাতিনাখালী এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার হিড়িক পড়ায় নিচু এলাকা ভরাটসহ নির্মানাধীন বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের কাছে বিক্রির উদ্দেশ্যে এসব বালু জমা জমা করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনের সমগ্র ঘটনার সাথে সাতক্ষীরার অতি প্রভাবশালী এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার কারনে বার বার ভাঙন মুখে পড়া উপকূলীয় জনপদের দুর্যোগ প্রবণ এলাকার নদী থেকে বালু উত্তোলনের পরও কেউ ‘টু’ শব্দটি পর্যন্ত করছে না।
যদিও বালু উত্তোলনের কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি কালিকাপুরের হাবিবুর রহমান বালু উত্তোলনের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি রয়েছে দাবি করলেও শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার তা অস্বীকার করেছেন।
এদিকে প্রবল ভাঙন প্রবণ পাউবোর ৭/১ নম্বর পোল্ডারের পদ্মপুকুরের পাতাখালী ও ঝাঁপা এলাকা থেকে ড্রেজারের সহায়তার বালু উত্তোলনের কারনে সংলগ্ন অংশের চর দেবে যাওয়াসহ পুনরায় উপকূল রক্ষা বাঁধ ভাঙনের শংকায় পড়েছে স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ নদীর মধ্যভাগ বা চর থেকে বালু উত্তোলনের কারনে নিচের বা গোড়ার অংশে মাটি সরে যাওয়ায় যেকোন মুহুর্তে সংলগ্ন এলাকার উপকূল রক্ষা বাঁধ নদীতে বিলীন হতে পারে।
পাতাখালী গ্রামের শাহিন বিল্লাহ বলেন, সিডর, আইলা, বুলবুল বা অম্পানে বার বার তাদের ইউনিয়নকে ঘিরে থাকা ্উপকূল রক্ষা বাঁধ ভেঙেছে। এসময় হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ফসল আর চিংড়ি প্রকল্প ভেসে যেয়ে শত শত কোটি টাকা ক্ষতির শিকার হয়েছে স্থানীয়রা। প্রভাব খাটিয়ে কিছু মানুষ পাশর্^বর্তী নদীর পাতাখালী অংশ থেকে লাখ লাখ ফুট বালু উত্তোলন করায় গোটা এলাকার মানুষের মধ্যে আাবারও ভাঙন আতংক ভর করেছে।
একই গ্রামের উত্তম মন্ডল ও স্মৃতি রানীসহ অন্যরা জানায় মাটি দিয়ে বাঁধ বাঁধার দাবি তোলা হচ্ছে ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে। সেখানে বাঁধের অনতিদুরের অংশ থেকে যদি বোরিং করে বালু উত্তোলন করা হয় তাহলে বাঁধ মেরামতের দরকার পড়ছে কেন। তারা অবিলম্বে খোলপেটুয়া নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে সরকারের সবোর্চ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
ঝাঁপা গ্রামের রনজিৎ, গোপাল, শরিফুল ও মনোয়ারা বেগমসহ কয়েকজন অভিযোগ করেন শুরুতে বালু উত্তোলন করে তাদের এলাকাকে ঝুঁকিপুর্ন না করতে অনুরোধ করা হলেও তাদের কথায় কর্নপাত করা হয়নি।
লব রপ্তান ও আজিজুল ইসলামসহ পদ্মপুকুরের অনেকেই শংকা প্রকাশ করে জানান কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে এসব এলাকার উপকূল রক্ষা বাঁধ ভাঙছে। এভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে সামনের দিনগুলোতে তাদেরকে সমুদ্রের জলরাশি থেকে রক্ষায় নির্মিত উপকূল রক্ষা বাঁধ নদীতে বিলীন হতে জলোচ্ছ্বাসেরও প্রয়োজন পড়বে না।
তারা আরও অভিযোগ করেন নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারনে বাঁধ ঝুঁকিপুর্ন অবস্থায় পৌছাচ্ছে জেনেও পাউবো কতৃপক্ষ অজ্ঞাত কারনে নীরবতা পালন করছে।
এদিকে দাতিনাখালী গ্রামের আনিছুজ্জামান সুমন ও রিয়াজুল ইসলাম জানান কালিকাপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান খোলপেটুয়া নদীতে কার্গোতে ড্রেজার স্থাপন করে বালু উত্তোলন করে দাতিনাখালী নিয়ে বিক্রি করছে। তারা আরও জানান শুরুতে আম্পান বিধ্বস্থ দাতিনাখালীর ভাঙন কবলিত অংশের রিং বাঁধ নির্মানের স্বার্থে জিও ব্যাগ ভরাটপুর্বক ডাম্পিং এর কথা বলে বালু এনেছে তারা। কিন্তু রিং প্রায় এক মাস আগেই রিং বাঁধ নির্মান শেষ হওয়ার পরও খোলপেটুয়া নদী থেকে বালু এনে জমা করছে বিক্রির জন্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন জানান ভাঙনের কারনে লবনাক্ত হয়ে যাওয়া তাদের মিষ্টি পানির পুকুর ভরাটের জন্য হাবিবুর রহমান ও তার লোকজন তদেরকে বালু কেনার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া দাতিনাখালী এবং বুড়িগোয়ালীনি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও রিসোর্ট গড়ে তোলার জন্য বহিরাগতরা যেসব জমি ক্রয় করছে তা ভরাটের কাজেও ব্যবহারের জন্যও খোলপেটুয়া নদী থেকে বালু উত্তোলন হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
অভিযোগ রয়েছে সাতক্ষীরা প্রভাবশালী এক ব্যক্তির ছত্রছায়ায় কালিগঞ্জ উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের হাববুর রহমান নিজে কার্গো ও ড্রেজার মেশিন আর নৌকা ব্যভহার করে বালু উত্তোলন ও মজুদ করছে।
এবিষয়ে মুটোফোনে যোগাযোগ করা হলে হাবিবুর রহমান বলেন, উপজলা নির্বাহী কর্মকর্তার লিখিত নির্দেশে তিনি বালু উত্তোলন করছেন। পরবর্তীতে তিনি আবারও যোগাযোগ করে বলেন, সাতক্ষীরার ঝড়– সাহেবের নামে অনুমতি নিয়ে তিনি বালু উত্তোলন করছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাতক্ষীরা সাব-ডিভিশন ২ এর (৭/১) নম্বর পোল্ডারের সেকশন অফিসার মশিউর রহমান বলেন, ভাঙন কবলিত এলাকার নদী থেকে বালু উত্তোলন অবশ্যই ঝুঁকিপুর্ন করবে গোটা এলাকাকে। বিষয়টি যেহেতু জানতে পেরেছি তাই সরেজমিনে যেয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এবিষয়ে শ্যামনগর উপজলা নির্বাহী অফিসার আ ন ম আবুজর গিফারী বলেন, বালু উত্তোলনের অনুমতি কাউকে দেয়া হয়নি। যতদ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নেয়া হবে।