সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান-সুপ্র সাতক্ষীরা জেলা শাখার সংবাদ সম্মেলন


355 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান-সুপ্র সাতক্ষীরা জেলা শাখার সংবাদ সম্মেলন
মে ১৪, ২০১৮ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

 

“অন্তর্ভূক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত করা”

নাজমুল আলম মুন্না ।

১৪ মে সোমবার সকাল ১০টায় সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান-সুপ্র সাতক্ষীরা জেলা কমিটির আয়োজনে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সম্মেলন কক্ষে আসন্ন ২০১৮-১৯ জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়। তারা বলেন, বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রান্তসীমায় অবস্থান করেও বর্তমানে উল্ল্যেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে অগ্রসরমান একটি দেশ। সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী ছিল ৭.২৮ শতাংশ। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা বিরোধী সংগ্রামে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে বিগত দশ বছরে। এই সময়ে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসলেও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এখনো ২৩.৫ শতাংশ (সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অক্টোবর ২০১৬) মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। একই তথ্যসূত্রে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে ৩৭.৬ মিলিয়ন মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক অগ্রগতি সত্বেও সমাজে বিদ্যমান জীবনযাত্রার বৈষম্য ক্রম-উর্দ্ধমূখী। আয় ও সম্পদ বাড়ছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের। সমাজের প্রান্তিক মানুষের আয় ও জীবনমান কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিবিএস এর চূড়ান্ত হিসেবে, বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় এখন ১৬১০ মার্কিন ডলার। বিগত দুই দশকে আমরা দারিদ্র্যের হার হ্রাস, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য অবস্থার উন্নতিসহ মানুষের জীবনমানে লক্ষ্যণীয় উন্নতি প্রত্যক্ষ করছি। অপরদিকে, দুর্ভাগ্যবশত একইসঙ্গে দেখছি অসমতা বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্যের বিস্তার, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যহত হওয়া এবং সমাজের ভেতরে অন্তর্ভূক্তি বিরোধী শক্তির বিচরণ।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে সরকারকে যে সব নতুন কর্মসূচি নিতে হবে, এজন্য আগামী ১৩ বছরে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ৯৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার লাগবে বাংলাদেশী মুদ্রায় যা ৭৫ লক্ষ কোটি টাকার সমান। এমডিজি’র মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে চরম দারিদ্র অনেকটাই কমেছে। এখন এসডিজিতে বলা হচ্ছে, কাউকে পেছনে রাখা যাবে না। কিন্তুু সারা পৃথিবীতে বৈষম্য বাড়ছে। বৈষম্য বা অসমতা কমাতে হলে একদিকে যেমন উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, তেমনি অন্যদিকে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের দেশীয় উৎস থেকে অর্থায়ন করতে হবে। এসডিজি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জোর দেয়ার পাশাপাশি মনিটরিং এ গুরুত্ব বাড়াতে হবে। সুপ্র এসডিজি’র ১,৩, ৪, ৫, ১০, ১৩, ১৬ ও ১৭ নম্বর লক্ষ্যসমূহ অর্জনে দেশব্যাপী তার প্রচারাভিযান শুরু থেকেই চালিয়ে আসছে। এসডিজি’র লক্ষ্যসমূহ অর্জনে খাতভিত্তিক বিশেষ বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন বলে সুপ্র মনে করে।

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হলে নানা ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বাংলাদেশ। স্বল্প সুদে যেমন ঋণ পাওয়া যাবে না, তেমন এলডিসি হিসেবে প্রাপ্ত বাণিজ্য সুবিধাও কমে যাবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এখনই একটি সমন্বিত পরিকল্পনা সরকারের হাতে নেয়া উচিৎ। এক্ষেত্রে আগামী ছয় বছর বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে বেশী মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আগামী ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৪ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। আর চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট মুল বাজেট থেকে কম হতে পারে ৪ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিলো ৪ লাখ ২৬৬ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া আগামী বাজেটে রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হবে বলে মাননীয় অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার ধরা হবে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ আর মূলস্ফীতি ধরা হবে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অত্যাবশ্যকীয় সেবাখাত বিশেষত: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবাখাতে ভ্যাট হার কমিয়ে করের বিপরীতে সেবার মান উন্নত করার জন্য অধিপরামর্শের কাজ দেশের ৪৫ টি জেলায় চালিয়ে যাচ্ছে সুপ্র। এরই ধারাবাহিকতায় আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০১৮-২০১৯ কে সামনে রেখে ৪৫ টি জেলার তৃণমূল জনগনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ও দরিদ্রবান্ধব জনদাবি ভিত্তিক সুপারিশমালা তুলে ধরতেই আজকের এই আয়োজন।

কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা আনয়নের মাধ্যমে দরিদ্রবান্ধব ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে হবে:
সম্প্রতি প্রত্যক্ষ করকে(মূলত আয়কর) প্রাধাণ্য দিয়ে বাজেটের আয়ের একটি বড় অংশ প্রাক্কলন করা হচ্ছে যেটা নি:সন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এক্ষেত্রে কর প্রশাসনকে আরো দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যাতে করে সরকারকে ঘুরে ফিরে সেই পরোক্ষ করের উপরই নির্ভর না করতে হয়। সম্পদ-বৈষম্য কমাতে হলে কর আদায় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। যারা বেশী আয় করেন তাদের কাছ থেকে বেশী কর আদায় করতে হবে। কিন্তুু বাংলাদেশে তুলনামূলক কম আয় করা লোকের উপর কর দেয়ার চাপ বেশী।
সুপ্র সাতক্ষীরা জেলা কমিটি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় সুধিজন, সাংবাদিক, সংগঠন প্রতিনিধি, সমাজ কর্মি সহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সুপ্র জেলা সম্পাদক মাধব চন্দ্র দত্ত, সভাপতিত্ব করেন বেগম মরিয়ম মান্নান, দাবীনামা উপস্থাপন করেন বরসা’র সহকারী পরিচালক মোঃ নাজমুল আলম মুন্না।

আগামী ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে সুপ্র’র প্রস্তাবিত সুপারিশমালাঃ
প্রত্যক্ষ কর নির্ভর বাজেট প্রণয়ন করতে হবে, করের বিপরীতে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে;
কর প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে; উপজেলা পর্যায়ে কর প্রশাসন নিয়ে যেতে হবে;
নিত্য প্রয়োজনীয় সেবা ও দ্রব্যের উপর মূসক বা ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে;
কর্পোরেটসহ সকল কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ও দৃঢ় পদেক্ষপ গ্রহণ করতে হবে; বহুজাতিক কোম্পানী কর রেয়াত সুবিধার পুনঃমূল্যায়ণ করতে হবে;
বাংলাদেশের বর্তমান তামাক কর কাঠামো অত্যন্ত জটিল। তামাক কর কাঠামো যুগোপযোগী করতে হবে;
ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০১৩ এবং ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০১৫ এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং তামাকপণ্যের উপর আরোপিত স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ২% উন্নীত করতে হবে;
জাতীয় শিক্ষানীতি’২০১০ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষাখাতে মোট বাজেটের কমপক্ষে ২০% বা জিডিপি’র ৬% বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে;
শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৩০ নিশ্চিত করতে হবে;
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ পথ বন্ধ করতে হবে। শিক্ষা কোন সুযোগ নয় নাগরিকের অধিকার। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে সকল ধরনের ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে;
দক্ষ মানব সম্পদ সৃষ্টিতে কারিগরী শিক্ষার আধুনিকায়ন ও জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে যাতে মানুষ শিক্ষায় বিনিয়োগ করে তার সুফল পেতে পারে।
মৌলিক চাহিদা নয়, স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে;
জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে কমপক্ষে জিডিপি-এর ৩ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ১০ শতাংশ বরাদ্দ দেয়ার পাশাপাশি বাজেটের সুষম বন্টন এবং বাজেট ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে;
ডাক্তার-রোগীর আনুপাতিক হার বৃদ্ধি করতে হবে (বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও অবহেলিত এলাকায়) ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অত্যাধুনিক স্বাস্থ্য সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে;
কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবার মান ও পরিধি বাড়ানোসহ কার্যকর মনিটরিং ব্যাবস্থা জোরদার করতে হবে; শুধু কমিউনিটি ক্লিনিক বাড়ালেই হবে না;
ভর্তুকি বৃদ্ধিসহ তৃণমূল কৃষকের চাহিদা ও দাবি বিশ্লেষণপূবর্ক অংশগ্রহণমূলক কৃষি বাজেট প্রণয়ন করতে হবে;
কৃষিতে নারী শ্রমিকের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম-মজুরির ব্যবস্থার জন্য সুনিদ্দিষ্ট আইন প্রণয়ন ও বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে;
প্রান্তিক কৃষকের ভর্তুকীর অর্থ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে; কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রবর্তন ও কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে;
জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিঘাতকে বিবেচনায় রেখে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য শস্য বীমা চালু ও সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা চালু করতে হবে;
অতি দরিদ্র জনগোষ্টীর ডাটা ব্যাংক তৈরীসহ ‘টারগেটেড ইন্টারভেনশন’ (ঞধৎমবঃঃবফ রহঃবৎাবহঃরড়হ) নিতে হবে;
প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনে, সম্পদ ও সুবিধা প্রদানে জনঅংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় জীবনচক্র ভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কার্যকর বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে;
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাজেটে খাতভিত্তিক বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে।