সুস্থতা ও নমুনা পরীক্ষায় পিছিয়ে বাংলাদেশ


220 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুস্থতা ও নমুনা পরীক্ষায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
মে ৪, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

করোনাভাইরাসে গতকাল রোববার পর্যন্ত দেশে ৯ হাজার ৪৪৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার ৫৭ দিনে ১৭৭ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এর বিপরীতে সুস্থ হয়ে উঠেছেন এক হাজার ৬৩ জন। তবে গত শনিবার পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ১৭৭। এক দিনের ব্যবধানে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তির সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। সরকারি হিসাবে গতকাল পর্যন্ত দেশে এই ভাইরাসে মৃত্যুহার ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। সুস্থতার হার ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নমুনা পরীক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। অর্থাৎ নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিকে আইসোলেশন এবং তার কন্টাক্ট ট্রেসিং করে অন্যদের কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া- এই প্রক্রিয়াই ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভালো উপায়। গতকাল পর্যন্ত দেশে প্রতি ১০ লাখে ৪৬২ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। পরীক্ষার হার শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ।
বিশ্বের সর্বোচ্চ সংক্রমিত সাতটি এবং এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি এবং প্রতিবেশী ভারতসহ মোট ১২টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মৃত্যু ও সুস্থতার হার এবং নমুনা পরীক্ষার পর্যালোচনা করে দেখা যায়- যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুহার কম। তবে রাশিয়া ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বেশি। শ্রীলঙ্কা ছাড়া প্রত্যেকটি দেশেই আক্রান্তের সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। অন্যদিকে সুস্থতা ও নমুনা সংগ্রহের দিক থেকে বাংলাদেশ সব দেশের পেছনে অবস্থান করছে।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সংক্রমণ শুরুর পর প্রায় দেড় মাস পর্যন্ত দেশে মৃত্যুহার ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত মানুষ বেশি শনাক্ত হচ্ছে। এ কারণে মৃত্যুহার কমেছে। সুস্থতার সংখ্যা গত শনিবার পর্যন্ত ছিল ১৭৭ জন। গতকাল সেটি এক হাজার ৬৩ জনে উন্নীত হয়েছে। এই বিষয়টি একটু আশ্চর্য লাগছে। কারণ সংক্রমণ শুরুর ৫৬ দিন পর্যন্ত ১৭৭ জন সুস্থ আর এক দিনেই সুস্থ হলেন ৮৮৬ জন। ভার্চুয়াল বুলেটিনে বলা হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি গাইডলাইন অনুযায়ী তাদের সুস্থ ঘোষণা করা হয়েছে। সেই গাইডলাইনটি কী, তা পরিস্কার করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিভ্রান্তি বাড়বে। এর পরও বৈশ্বিক পরিস্থিতির তুলনায় বাংলাদেশে সুস্থতার হার এখনও অনেক কম। একইসঙ্গে ৩১টি সেন্টারে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাও বিশ্বের তুলনায় অনেক কম। এই জায়গাগুলোতে উন্নতি করতে হবে।
চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, বর্তমানে দেশে ঠিক কত সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত তা জানতে পারছি না। সীমিত সংখ্যক মানুষের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা সমীচীন নয়। করোনা সন্দেহভাজন হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা তিনশ’ ছাড়িয়েছে। সেগুলো তো পরীক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। তাহলে মৃত্যুহার কীভাবে নিরূপণ করা হবে? আবার সংক্রমণ শুরুর ৫৬ দিন পর্যন্ত মোট সুস্থ বলা হলো ১৭৭ জনকে। পরবর্তী এক দিনেই ৮৮৬ জনকে সুস্থ ঘোষণা করা হলো। বলা হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাইডলাইন মেনে তাদের সুস্থ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু গাইডলাইনটি সম্পর্কে তো বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। আগে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০ মানুষের পরীক্ষা করা হতো। এখন পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন, এমন আরও কয়েক হাজার মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। পরীক্ষার অভাবে আক্রান্ত মানুষ বাসা বাড়িতে অবস্থান করে পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিশছে। এভাবে ভাইরাসটি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা যা-ই বলি না কেন স্বাস্থ্য বিভাগ তাতে কর্ণপাত করছে না। স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্নিষ্টদের অব্যবস্থাপনার কারণেই রোগটি দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তারা রোগটির গুরুত্ব অনুধাবন করে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এর বিস্তার রোধ করা সম্ভব হতো।

ওয়ার্ল্ডওমিটারস ডট ইনফো নামের ওয়েবসাইট বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে। ওই ওয়েবসাইটে গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বিশ্বে করোনাভাইরাসে ৩৫ লাখ ২ হাজার ৯৫৬ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৮১ জনের এবং সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১১ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৮ জন। অর্থাৎ মৃত্যুহার ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ। সুস্থতার হার ৩২ দশমিক ২২ শতাংশ। এখানে বিশ্বের ১২টি দেশের আক্রান্ত ও মৃত্যুর চিত্র তুলে ধরা হলো।

যুক্তরাষ্ট্র :বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত হয়েছেন ১১ লাখ ৬০ হাজার ৮৪০ জন। মৃত্যু হয়েছে ৬৭ হাজার ৪৪৮ জনের। সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭২৫ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ লাখে ২০ হাজার ৯৪০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার ২ দশমিক ০৯ শতাংশ।

স্পেন :দ্বিতীয় অবস্থানে স্পেনে আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখ ৪৫ হাজার ৫৬৭ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৫ হাজার ১০০ জনের। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৩৩ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ১০ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ৫৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ। স্পেনে প্রতি ১০ লাখে ৩২ হাজার ৬৯৯ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ।

ইতালি : তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইতালিতে আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখ ৯ হাজার ৩২৮ জন। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৮ হাজার ৭১০ জনের। সুস্থ হয়েছেন ৭৯ হাজার ৯১৪ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ১৩ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং ৩৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। ইতালিতে প্রতি ১০ লাখে ৩৪ হাজার ৮৭৯ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

ফ্রান্স : চতুর্থ অবস্থানে থাকা ফ্রান্সে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৯৬ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৪ হাজার ৭৬০ জনের। সুস্থ হয়েছেন ৫০ হাজার ৫৬২ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ৩০ দশমিক ০২ শতাংশ। প্রতি ১০ লাখে ১৬ হাজার ৮৫৬ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার ১ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

জার্মানি :পঞ্চম অবস্থানে থাকা জার্মানিতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৬৭ জন। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৬ হাজার ৮১২ জনের। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১ লাখ ৩০ হাজার ৬০০ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ৪ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ৭৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। প্রতি ১০ লাখে ৩০ হাজার ৪০০ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার ৩ দশমিক ০৪ শতাংশ।

রাশিয়া : ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা রাশিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮৭ জন। মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৮০ জনের। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১৬ হাজার ৬৩৯ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। প্রতি ১০ লাখে ২৮ হাজার ৯৫ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার ২ দশমিক ৮০ শতাংশ।

তুরস্ক : তুরস্কে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৭৫ জন। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৩৩৬ জনের। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৫৮ হাজার ২৫৯ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং ৪৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ। প্রতি ১০ লাখে ১৩ হাজার ১৭৭ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার এক দশমিক ৩১ শতাংশ।

ইরান : ইরানে আক্রান্ত হয়েছেন ৯৬ হাজার ৪৪৮ জন। মৃত্যু হয়েছে ৬ হাজার ১৫৬ জনের। সুস্থ হয়েছেন ৭৭ হাজার ৩৫০ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং ৮০ দশমিক ১৯ শতাংশ। প্রতি ১০ লাখে ৫ হাজার ৯০৯ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ।

চীন : চীনে আক্রান্ত হয়েছেন ৮২ হাজার ৮৭৭ জন। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৬৩৩ জনের। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৭৭ হাজার ৭১৩ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং ৯৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ। তবে চীনে নমুনা পরীক্ষার কোনো সংখ্যা ওয়েবসাইটটিতে পাওয়া যায়নি।

ভারত : ভারতে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৯ হাজার ৯৮০ জন। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৩২৩ জনের। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১০ হাজার ৮১৯ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ ও ২৭ দশমিক ০৬ শতাংশ। প্রতি ১০ লাখে ৭৫৮ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার শূন্য দশমিক ০৭ শতাংশ।

পাকিস্তান : পাকিস্তানে আক্রান্ত হয়েছেন ১৯ হাজার ১০৩ জন। মৃত্যু হয়েছে ৪৪০ জনের। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৪ হাজার ৮১৭ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ২ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ২৫ দশমিক ২১ শতাংশ। পাকিস্তানে প্রতি ১০ লাখে ৯১৯ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ।

শ্রীলঙ্কা : শ্রীলঙ্কায় আক্রান্ত হয়েছেন ৭০৫ জন। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১৮২ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং ২৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। প্রতি ১০ লাখে ১ হাজার ১৭৭ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এই হার শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ।

বাংলাদেশ : বাংলাদেশে আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৪৪৫ জন। মৃত্যু হয়েছে ১৭৭ জনের। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১ হাজার ৬৩ জন। মৃত্যু ও সুস্থতার হার যথাক্রমে ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ। পরীক্ষা হয়েছে প্রতি ১০ লাখে ৪৬২ জনের। এই হার শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছালে তাকে সুস্থ বলা হবে, সে সম্পর্কিত একটি গাইডলাইন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি করেছে। সে অনুযায়ী এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৩ জনকে সুস্থ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে গাইডলাইন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি তিনি।