সেই রাত ছিলো শোকাবহ ও স্মরণীয়


412 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সেই রাত ছিলো শোকাবহ ও স্মরণীয়
মার্চ ২৮, ২০১৭ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ মন্ময় মনির ॥
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত ছিলো আর্তনাদের। সেই রাত ছিলো ভয়াল। সেই রাত ছিলো শোকাবহ।  সেই রাত ছিলো স্মরণীয়। সেই রাত ছিলো স্বজন হারানোর। সেই রাত ছিলো গভীর ক্রন্দনের। সেই রাতে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিলো। হত্যা করেছিলো সহস্র সহস্র মানুষ। সেই রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী প্রচন্ড ভয়াবহতা সৃষ্টি করেছিলো সকল বাঙালির মনে। সেই মানুষের মধ্যে কেউ ছিলো শিশু, কেউ নারী, কেউবা পেশাজীবী। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতাকে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী সেই ২৫ মার্চের রাতে হত্যা করেছিলো। ক্রন্দন আর আহাজারিতে ঢাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিলো। স্বজন হারানোর বেদনায় বেদনার্ত ছিলো সমগ্র বাংলাদেশ। শোকে মুহ্যমান, স্তব্ধ ছিলো সেই ২৫ মার্চের রাত। কেউ বলেন, সন্ধ্যার পরেÑ কেউ বলেন, রাত ১০টার পরেÑ আবার কেউ বা বলেন, রাত ১১.৩০ মিনিটের পর পাকিস্তান সামরিক জান্তা ইয়াহিয়ার নির্দেশে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নিরাপরাধ, নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালির উপর অপারেশন সার্চ লাইটের নামে গণহত্যা করেছিলো। গত ১৭ মার্চ ২০১৭ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক লিখেছেন, ‘২৫ মার্চের মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর গণহত্যা শুরু করলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং তার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।’ স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বাঙালির লাখো বীর সন্তানকে কাজ করতে হয়েছিলো প্রায় ২৪টি বছর। একদিনে আসে নি আমাদের স্বাধীনতা। একরাতে আসে নি আমাদের স্বাধীনতা। দীর্ঘ আন্দোলন- সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। মাত্র ১৮ দিন পূর্বে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে উচ্চারণ করেন Ñ
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত ৭ মার্চের সেই ভাষণ ছিলো সহজ-সরল। সেই ভাষণে তিনি স্বাধীনতার সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। তিনি ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সংগ্রাম কমিটি গঠন করে সর্বত্র প্রতিরোধ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে কোনো জটিলতা ছিলো না, ছিলো না কোনো কুটিলতা। বাঙালি জাতি সত্তার জাগরণের কথা ছিলো সেই ভাষণে। বীরত্বপূর্ণ সেই ভাষণ ছিলো বাঙালির গণজাগরণেরÑ আত্মশুদ্ধিরÑপরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির। বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঘোষণা ছিলো সেই ভাষণে। আমাদের স্বাধীনতা প্রদানে পাকিস্তানের কোনো কৃতীত্ব ছিলো নাÑছিলো শুধু মানুষহত্যা, নারীধর্ষণ, নিরস্ত্র মানুষকে খুন, ঘরবাড়ি জ্বালানো- পোড়ানো, নারীর উজ্জত লুণ্ঠন, শস্যক্ষেত্র বিনষ্ট, আমানবিক নির্যাতন-শোষণ-নিপীড়ন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ‘বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ’ নামে খ্যাত ৬ দফা ঘোষণা করেছিলেন। তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রধান।
২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যখন নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করেছিলো তখন বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামালসহ লাখো, বাঙালি দেশপ্রেমিক, পুলিশ ও আর্মির সদস্যরা, ছাত্র-জনতা কাকরাইল মোড়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানাসহ বাংলাদেশের সর্বত্র প্রতিরোধব্যুহ তৈরি করেছিলো। সেই রাতে ঘুমন্ত নারী-শিশুদের উপরে যেভাবে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী অত্যাচার করেছিলো তাতে যদি প্রতিরোধব্যুহ গড়ে না উঠতো তাহলে বাঙালি জাতির আরো ব্যাপক ক্ষতি হতো। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তিনি উচ্চারণ করেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন….’
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যার জন্য তৎকালীন পাকিস্তান ইয়াহিয়া, টিক্কা খান সরকার বিশ্বের কাছে নিন্দিত- ঘৃণিত হয়ে থাকবে চিরদিন। ২৫ মার্চ চিহ্নিত হয়ে থাকবে একটি ভয়াবহ রাত হিশেবে, একটি শোকাবহ রাত হিশেবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ তাই একান্ত অপরিহার্য। অবশ্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং পত্র-পত্রিকায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কর্তৃক সংগঠিত ও সংঘটিত ২৫ মার্চ রাতের সেই ভয়াল দৃশ্য, বর্বরতা স্পষ্ট অক্ষরে ছাপা আছে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাঙালির শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো পাকিস্তানি ঘাতকেরা। এজন্যে, ১৪ ডিসেম্বর ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মরণ দিবস’ হিশেবে পালন করলে ভালো হয়। সমগ্র মুসলিম জাহান পবিত্র লাইলাতুল কদর পালন করে। সেই রাত মহিমান্বিত। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত বাঙালিদের জন্য শোকের-বেদনার-স্মরণের। আর ২৬ মার্চ অর্জনের। আমাদের বাঙালিদের স্মরণীয় কোন রাত পালন করা হয় না। তাই ২৫ মার্চ ‘স্মরণীয় রাত’ হিশেবে পালন করলে ভালো হয়। মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হানসহ আরো যেসমস্ত প্রথিতযশা খ্যাতিমান সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রফেসর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের  প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। শহীদ জহির রায়হান ২৫ মার্চের সেই বর্বরোচিত গণহত্যাকান্ডকে বন্ধ করার জন্যে নির্মাণ করলেন কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘ঝঃড়ঢ় এবহড়পরফব’. এবহড়পরফব- এর আবিধানিক বাংলা অর্থ হচ্ছে- (ব্যাপক হত্যাদি দ্বারা বা জীবন ধারণের পক্ষে সম্পূর্ণ প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করিয়া) কোন জাতি বা সম্প্রদায়ের বিলোপ সাধন।
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভূটান বাংলাদেশের প্রথম স্বীকৃতি দেয়। এরপর ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশের স্বীকৃতি দেয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বে একের এক দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ‘গণহত্যা’ একটি নেতিবাচক বিষয়, জঘণ্য ঘটনাÑযা ঘটিয়েছিলো পাকিস্তান সামরিক জান্তাÑবর্বর হানাদার বাহিনী। আন্তর্জাতিক মহলের স্বাক্ষ্যগ্রহণ আমাদের অপরিহার্য। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যার যে বিভৎস দৃশ্য পৃথিবীবাসী নিজ চোখে, পত্র-পত্রিকায় মিডিয়ায় দেখেছে, শুনেছে, তা সত্যিই হৃদয় বিদারকÑমর্মান্তিক। অবশ্য, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে ও পরে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আরো লাখ লাখ গণমানুষকে হত্যা করেছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সামরিক জান্তা কর্তৃক প্রতিদিন-প্রতিরাত গণহত্যা হয়েছিলো। মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে, পরে এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে অসংখ্য মানুষ। তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। হৃদয়ের গহীন প্রদেশ থেকে তাঁদেরকে স্মরণ করি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নিহত বাঙালিদের শহীদ হিশেবে ঘোষণা দিতে হবে। এটি সরকারের কাছে আমার আকূল আবেদন। শহীদদের স্মরণের জন্য ২৫ মার্চ তারিখটি নির্ধারণ করা হয়েছে এটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত এবং প্রাসঙ্গিক। তবে, আমার দৃষ্টিতে ‘শহীদ স্মরণ দিবস’ হলে ভালো হয়। অথবা ২৫ মার্চ নিহতদের স্মরণে ‘শোকাবহ রাত’ অথবা ‘স্মরণীয় রাত’ হিশেবে পালন করলেও ভালো হয়।
গণহত্যা প্রতিরোধ করতে হবে আমাদের। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কর্তৃক ২৫ মার্চসহ সকল হত্যাকান্ডেরÑ নির্যাতনের নিন্দা ও ঘৃণা জানাই। দোষীদের আন্তর্জাতিক আদালতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। ঘৃণা জানাই যারা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিলো। রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ নাম ধারণ করে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগিতায় যারা বাঙালিদের হত্যা করেছিলো সেই পাকিস্তানী হায়েনাদের দ্রুত বিচারপূর্বক শাস্তি চাই।
আমি সকল বাঙালিদের বিনীত অনুরোধ জানাই বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্যে যে সমস্ত মানুষ আত্মউৎসর্গ করেছেন তাঁদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাঁদের সকলকে স্মরণ করছি। যাঁরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তাঁদের সকলের প্রতি সমবেদনা জানাই।
এ প্রেক্ষিতে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানাই বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় শহীদ মিনারের পাশে একটি করে জাতীয় স্মৃতি সৌধ নির্মাণের ব্যবস্থা করার জন্য। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। জয় বাংলা।

লেখক : মন্ময় মনির
সভাপতি মন্ডলীর সদস্য
কবিতা পরিষদ সাতক্ষীরা