সৌম্যর ‘পেরিস্কোপ’


1188 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সৌম্যর ‘পেরিস্কোপ’
জুলাই ১৭, ২০১৫ খেলা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
এই তো সেদিন, বিশ্বকাপের সময় মেলবোর্নের এক বিকেল। শহরে এসেছেন লুইস হ্যামিলটন, মোটর রেস চলছে হোটেল থেকে একটু দূরেই। দলে দলে লোক যাচ্ছে ওই এফ ওয়ান রেস দেখতে। লিঁয়াজোর দায়িত্বে থাকা অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রলোকটি হাতে টিকিট নিয়ে অনেককেই সেধেছিলেন। হোটেল রুম ছেড়ে কেউ বোরোতে রাজি হননি। সৌম্য গিয়েছিলেন ওই রেস দেখতে। ছাত্রের আগ্রহ দেখে খুশি হয়েছিলেন হাথুরুসিংহে, একদিন গল্পে গল্পেই বলছিলেন সৌম্যর গভীরে দেখা সম্ভাবনার মুক্তা, ‘ও হচ্ছে রিয়েল স্পোর্টসম্যান, আর এরা সব ধরনের স্পোর্টসই দেখতে পছন্দ করে। খেয়াল করে দেখবেন ওর হ্যাট পরা, কোমরে রুমাল গুঁজে রাখা, আর্ম ব্যান্ড পরার মধ্যে স্টাইলিশ ব্যাটসম্যানের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর ওকে চড়াও হতে হয় না, ও শুধু ব্যাটিংটা করে নিখুঁতভাবে…’ প্রতিপক্ষের ‘ঘাতক’ নয়, হাথুরু বোঝাতে চাইছিলেন সৌম্য একজন ‘শৈল্পিক ব্যাটসম্যান’। নতুন বাংলাদেশের ‘ওয়ান্ডার বয়’।
পুল, হুক, ফ্লিক_ যে শটগুলো খেলতে ক্রিকেটের ব্যাকরণ মানতে হয়, সেগুলোতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বাংলাদেশের নতুন এ সেনসেশন।

তেড়েফুঁড়ে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে শট খেলতে হয় না তাকে, বাউন্ডারিতে বল পাঠাতেও গায়ের পুরো শক্তি দিতে হয় না, শুধু কব্জির জোরে বলের নিখুঁত টাইমিং করেই ক্রিকেটবিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বছর তেইশের এ ছেলে, যাকে নিয়ে আইসিসির ফেসবুক পেজেও তোলপাড় শুরু হয়েছে। দিলশানের দিলস্কুপ আর মহেন্দ্র সিং ধোনির ‘হেলিকপ্টার’ শটের মতো সৌম্যর নিজস্ব একটি শটকেও ‘পেরিস্কোপ শট’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ক্রিকেট বইয়ে নতুন এক শটের আমদানি করেছেন বাংলাদেশের ওপেনার সৌম্য সরকার। ব্যাটকে গিটার চালানোর ভঙ্গিতে যে বাউন্সারগুলো বা শর্ট বলগুলোকে তিনি কিপারের মাথার ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দেন, সেগুলোকেই পেরিস্কোপ (যে যন্ত্র দিয়ে ডুবোজাহাজ থেকে ওপরের দৃশ্য দেখা হয়ে থাকে) শট বলা হচ্ছে। বুকের কাছাকাছি উঠে আসা বলগুলো শচীনও আপার কাট খেলেছেন, কিন্তু সৌম্য সেগুলো খেলেন কিছুটা দেরিতে, বলের লাইন কিছুটা দেখে তার পর আপার কাট করেন, এ কারণেই সেটা ‘পেরিস্কোপ’। পায়ের পাতায় ভর দিয়েও এ শট খেলতে পারেন তিনি। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে কোথাও কোথাও তার সঙ্গে পাকিস্তানের সাঈদ আনোয়ারের তুলনা করা হচ্ছে।

বলা হচ্ছে, সৌম্যর ফ্লিকগুলো নাকি নব্বইয়ের দশকের সাঈদ আনোয়ারের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ভারত সিরিজ কভার করতে আসা সাংবাদিকরা অফসাইডে সৌম্যর বাউন্ডারি হাঁকানো দেখে সৌরভ গাঙ্গুলীর সঙ্গেও তুলনা করছেন। কভার আর পয়েন্টের মাঝে ফাঁক গলিয়ে সৌরভ যেমন বাউন্ডারি ছুটাতেন, সৌম্যও নাকি তেমনই করছেন। মিরপুরের প্রেসবক্স থেকেই গত সিরিজে কলকাতার এক সাংবাদিক সৌম্যর ব্যাটিং চলার সময় সৌরভ গাঙ্গুলীকে ফোন দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন সৌম্যর খেলা তিনি দেখছেন কি-না? সৌরভ গাঙ্গুলী ঠিকই দেখেছিলেন সৌম্যর ব্যাটিং। পরের দিন কলকাতার এক দৈনিকে শিরোনামও হয়েছিল_ ‘সৌম্যতে নিজের ছায়া দেখছেন সৌরভ’। তবে আইসিসির ফেসবুক পেজে সৌরভ গাঙ্গুলীর চেয়েও সৌম্যর স্টাইলকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। বলা হচ্ছে, সৌরভ অন্তত শর্টবলগুলোতে আপার কাট খেলতে পছন্দ করতেন না। চট্টগ্রামে সিরিজে শেষ ম্যাচটিতে কিন্তু সৌম্য মাঠের সব দিক দিয়েই বাউন্ডারির রাস্তা বের করেছিলেন। মরকেল আর অ্যাবোটের মতো ঘণ্টায় ১৪২ কিলোমিটার গতিতে বোলিং করা বোলারদের নিদ্বর্িধায় পুল আর হুক করেছেন। রাবাদাকে মিড উইকেট দিয়ে আছড়ে ফেলেছেন। পা না নাড়িয়ে জায়গায় দাঁড়িয়েই অ্যাবোটকে তিনি ‘পেরিস্কোপ’ খেলেছেন। কোনো কোনো ব্যাটসম্যান আপার কাট খেলেন শুধু বলের গতি কাজে লাগিয়ে, সৌম্য এই বলগুলোকেই লেট কাটে খেলে থাকেন। স্পিনারদের স্কয়ার কাট, স্কয়ার ড্রাইভ আর কভার ড্রাইভও খেলেছেন এদিন দারুণভাবে। ফুট মুভমেন্ট খুব বেশি না থাকলেও ব্যাকফুটে গিয়ে চড়াও হতে পারেন শুধু কব্জির জোর কাজে লাগিয়ে। মিড উইকেট, মিডঅন, লংলেগের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্ভেদ্য জায়গাগুলো দিয়ে তিনি নিয়মিত বাউন্ডারি ছোটাতে পারেন।

আর এই স্টাইলিশ ব্যাটিংয়ের কারণেই অল্প ক’দিনেই দর্শকদের মনে বড় একটা জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। মিরপুর কিংবা মেলবোর্ন প্রতিটি গ্যালারিতেই দেখা গেছে, সৌম্যর ব্যাটিং-দর্শন মুগ্ধ করেছে গ্যালারিকে। শুধু সমর্থক নন, মাশরাফির ড্রেসিংরুমেও এখন তিনি আদুরে ‘দাদা’। মাত্র ১৬ ম্যাচের ওয়ানডেতেই দলের আস্থার বড় একটা জায়গাজুড়ে তিনি। ব্যাটিং গড় এরই মধ্যে ৪৯.৪২। স্ট্রাইক রেট ১০২.৫১। চার মেরেছেন ৯২টি আর ছক্কা ১১টি! ইংল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো টপ র‌্যাংকিংয়ের দলগুলোর বিপক্ষে দিন দিন স্পষ্ট হয়ে গেছে তার ব্যাটিংশৈলী। ইদানীং বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে ‘অ্যাটাক’ শব্দটি নিয়ে বেশ আলোচনা; কিন্তু সৌম্য দেখিয়ে দিয়েছেন স্নায়ু শীতল রেখেও আক্রমণ করা যায়, যদি তার ব্যাটিংশৈলী থাকে। কভার শট খেলে কয়েকটি ম্যাচে আউট হয়েছিলেন তাই দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সেটি খেলেনইনি। ঠিক এভাবেই নিজেই নিজের যত্ন নিতেন। জুটি বাঁধতে, জুটি বাঁধাতে তাকেই সচেতন হতে হবে, চারপাশের জৌলুস আর অক্রিকেটীয় ব্যাপারগুলোর লোভনীয় হাতছানি থেকে নিজেকেই নিজের গা বাঁচাতে হবে। ধ্যানে-জ্ঞানে সারাক্ষণ শুধু ক্রিকেটেই মনোসংযোগ করতে হবে। তাহলেই টিকে থাকবে তার ‘পেরিস্কোপ’, জ্বলজ্বল করবে সৌম্য সরকারের নাম।