স্মরণ : স্মৃতিতে অমলিন কাফেলার সম্পাদক আব্দুল মোতালেব


180 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
স্মরণ : স্মৃতিতে অমলিন কাফেলার সম্পাদক আব্দুল মোতালেব
জুন ২, ২০২২ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ সুভাষ চৌধুরী ॥

স্মৃতি অমোচনীয়। স্মৃতি কখনও মুছে ফেলা যায় না। স্মৃতি কেবলমাত্র ধূলোর আবরনে ঢাকা পড়ে থাকে। ক্ষণে ক্ষণে তা প্রতিভাত হয়ে ওঠে। আর তখনই স্মৃতি রোমন্থনে আমরা নিজেদের জাগিয়ে তুলি।
যার স্মৃতি নিয়ে আজকের এই লেখা তিনি হলেন সাতক্ষীরার প্রথম দৈনিক, দৈনিক কাফেলার সম্পাদক আব্দুল মোতালেব। যার জীবন এবং কর্ম ছিলো শিক্ষাঙ্গন, সংবাদপত্র এবং দূর্যোগপীড়িত মানুষের সাথে। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্তও তিনি সে কাজ করে গেছেন। জন্ম দিয়েছেন অগণিত স্কুলকলেজ ও মাদ্রাসার। সংবাদপত্রকে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছেন। নারী শিক্ষার গগন বিস্তারিত সম্প্রসারন করতে পেরেছেন। দূর্যোগপীড়িত মানুষের কাছে তিনি রেড ক্রিসেন্টের খাদ্য, চিকিৎসা, বস্ত্র এবং গৃহআচ্ছাদন নিয়ে বারবার পৌছে গেছেন।
সাতক্ষীরার মানুষের প্রথম অভিজ্ঞতা ২০০০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ভয়াবহ বন্যা। অসময়ের এই বন্যায় ভারতীয় পানির ঢলে সাতক্ষীরার একতলা উঁচু ভবনের ছাদ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে ছিল। এমনই এক দু:সময়ে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি মো: সাহাবুদ্দিন সাতক্ষীরায় এসেছিলেন। সার্কিট হাউজে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বন্যার ওপর ব্রিফিং দেওয়ার জন্য যশোর জিওসি মেজর জেনারেল আশফাক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি হলরুমে ঢুকেই দর্শক গ্যালারির দিকে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকাতে থাকেন। এসময় তিনি বললেন, ‘এখানে আসেননি মোতালেব সাহেব ? ওই যিনি রেড ক্রিসেন্টের বিভিন্ন পন্য বিতরণ করে থাকেন এবং টেলিভিশনে খবর দেন, তিনি আসেননি?’। রাষ্ট্রপতিকে এসময় অবহিত করে বলা হয় আব্দুল মোতালেব এই মুহূর্তে ঢাকায় রয়েছেন। রেড ক্রিসেন্টের সহায়তা পন্য আনার জন্য। এ ঘটনাই প্রমান করতে যথেষ্ট যে, আব্দুল মোতালেব ঝড়ঝঞ্ঝা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের সময় রেড ক্রিসেন্টের পন্য নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতেন। তিনি সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে ছিলেন না। রেড ক্রিসেন্টের জাতীয় কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি কাজ করতেন। রাষ্ট্রপতি তাকে সেই স্বীকৃতিই দিয়ে গেলেন।

সাতক্ষীরার আহমাদিয়া প্রেসের নাম কে না জানে। এই প্রেসের অফিসকক্ষে তার চেয়ারটেবিল ঘিরে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি বসতো আড্ডা। আহমদিয়া প্রেসের সেই আড্ডায় যোগ দিতেন সাংবাদিক, শিক্ষক, প্রশাসনের কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের মানুষ, আইনজীবি এমন অনেকেই। চলতো গল্পের পর গল্প। আর সেই আড্ডায় বারবার আসতো চা আর পান। হাসিতে খুশিতে তিনিই আড্ডাকে মাতিয়ে রাখতেন। এই আড্ডায় মানুষ আসতো গ্রাম থেকেও। তারা কেউ চাকুরি, কেউ আর্থিক সহায়তা, কেউ এলাকার উন্নয়ন, কেউ খাবার পানির জন্য টিউবওয়েল বসানো, কেউবা দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্যখাবার নিতে এই আড্ডায় যোগ দিতেন। তাদের প্রত্যেককেই কোন না কোনভাবে তিনি সন্তুষ্ট করে বাড়িতে পাঠাতেন।
আব্দুল মোতালেবের ডান হাতে ছিল একটি টেলিফোন, নম্বর থ্রি সেভেন ফাইভ (৩৭৫)। মুহূর্তে মুহূর্তে ফোন উঁচু করে কথা বলতেন। স্থান বিশেষে সমস্যা জানাতেন। সমাধানের পথও বের করে নিতেন। এই ৩৭৫ টেলিফোনটি ছিল সবার জন্য খোলা। অ্যানালগ ক্যাটাগরির এই ফোনে বুকিং দিয়ে সাংবাদিক সহ সকলেই সাতক্ষীরার বাইরে ঢাকা, খুলনা, যশোর এমনকি দূরবর্তী জেলায়ও কথা বলতেন। এতে তিনি কোনরকম অসন্তোষ বোধ না করেই আবারও হাসিতে খুশিতে মাতিয়ে রাখতেন। বলতেন, এই কাশেম চা নিয়ে আয়, পান নিয়ে আয়। আহমাদিয়া প্রেসের সেই বহু প্রাচীন আড্ডাটা আজ আর নেই। এখন সেখানে হাসির ফোয়ারা বয় না, মানুষের কষ্টের কথাও সেখানে কেউ নিয়ে আসে না। আহমাদিয়া প্রেসের বাইরের দেওয়ালের গায়ে ছিল পোস্ট অফিসের লাল রঙের একটি লেটার বক্স। এই বক্সেই তিনি বিভিন্ন চিঠিপত্র এবং সংবাদ ভরে দিতেন। সেই লেটার বক্সটিও আজ আর নেই।

তিনি ছিলেন স্কাউট কমিশনার। সারা দেশে স্কাউট আন্দোলনকে তিনি বেগবান করেছিলেন।
একজন বিদগ্ধ শিক্ষানুরাগী হিসেবে আব্দুল মোতালেব একসময় ৯০টিরও বেশি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। এসব স্কুল তিনি নিজ উদ্যোগে তৈরী করেছেন। সেখানে চাকরি দিয়েছেন স্থানীয় বেকার শিক্ষিত যুবকদের। চাকরি পাওয়া সেইসব শিক্ষকরা আব্দুল মোতালেবের মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তার পাশে থেকে তাকে সালাম জানিয়ে গেছেন। এখন তাদের বেশীরভাগই অবসরে চলে গেছেন। নারী শিক্ষায় তার যে অবদান তা অনস্বীকার্য। স্কুলে জনবল সুযোগ না থাকায় বেকার শিক্ষিতদের নিয়ে তিনি পাশেই নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে সেখানে তাদের চাকুরি দিয়েছেন। এমন বিরল দৃষ্টান্ত কয়জন দেখাতে পারেন ? একেকটি স্কুলের উন্নয়নের জন্য তিনি শিক্ষাবোর্ড এবং ঢাকায় শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে নিজেই ছোটাছুটি করেছেন। একাডেমিক স্বীকৃতি, বেতন বরাদ্দ এই সবকিছুই তিনি নিজ হাতে মন্ত্রনালয় থেকে আদায় করেছেন।

তার সম্পাদনায় ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক কাফেলা। নিজের আহমাদিয়া প্রেসে এই পত্রিকা ছাপা হতো। এই প্রেসে গোপনে ছাপা হতো বিভিন্ন স্কুলের প্রশ্নপত্র, নির্বাচনী প্রচারপত্র ইত্যাদি। সাপ্তাহিক কাফেলা দৈনিকে উন্নীত হয় ৯০’এর দশকে। সেই থেকে পত্রিকাটি আজ অবধি প্রকাশিত হতে থাকলেও মোতালেব বিহীন সংবাদপত্র হিসাবে তার সামাজিক কদর বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। তার হাত ধরে সাতক্ষীরার বহু সাংবাদিক নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা এখন জাতীয় পর্যায়ের মিডিয়ার সাথে যুক্ত থেকে সাতক্ষীরাকে আলোকিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। স্থানীয় পত্রিকাগুলির ক্ষেত্রেও আব্দুল মোতালেবের অবদান কম ছিল না। তার কাছ থেকে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি নিয়েছেন বহুজন। অকপটে সেকথা সকলকেই স্বীকার করতে হবে। তিনি নিজে দৈনিক কাফেলার সম্পাদনা ছাড়াও বাংলাদেশ অবজারভারের সাতক্ষীরা করেপন্ডেন্ট এবং ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাতক্ষীরা জেলা সংবাদদাতা হিসাবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। সাংবাদিকতায় বিশেষ করে গ্রামীন সাংবাদিকতায় তার সাংগঠনিক যোগ্যতার প্রমান মেলে তিনি যখন বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে এই দায়িত্বে থেকে তিনি দেশের তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকদের সংগঠিত করে তাদের পেশাকে আরও তাৎপর্যময় করে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছেন। একজন রেডক্রিসেন্ট ব্যক্তিত্ব হিসাবে তিনি বিদেশ সফর করেছেন। সেসব দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন মানবসেবার মাধ্যমে। এখনও তার ঘরে গেলে দেখতে পাওয়া যাবে অগণিত সংখ্যক অভিনন্দনপত্র এবং বিরল ছবি। এ থেকে তিনি বারবার স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং বহুবারের সভাপতি। এই প্রেসক্লাবে তিনি উন্নয়নের ধারা সূচনা করেছেন। এই প্রেসক্লাবে তিনি সদস্যপদ দিয়েছেন বহু সাংবাদিককে।

স্কুলকলেজে উন্নয়নধারা বৃদ্ধির জন্য তিনি মন্ত্রী, বিভাগীয় কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার এবং মহকুমা প্রশাসক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নিয়ে আসছেন এবং সেখানেই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ঘোষনা দিতে বাধ্য করতেন।
আব্দুল মোতালেবের হাত দিয়ে কেবল ছেলেরাই নন, চাকরি পেয়েছেন মেয়েরাও। এভাবে নারীশিক্ষাকে তিনি যেভাবে আলোকিত করেছেন এমনটি পাওয়া খুবই দুষ্কর। তার হাত দিয়েই নারী অধ্যক্ষ, নারী প্রভাষক, নারী শিক্ষক এবং নারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন অগণিত। তাদেরকে ক্ষমতায়িত করার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে কাজ করে গেছেন আব্দুল মোতালেব।

সাতক্ষীরায় সংসদ নির্বাচন থেকে স্থানীয় পর্যায়ের সকল নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রার্থীরা আসতেন তার দোয়া নিতে। তারা তাকে নিয়ে যেতেন বিভিন্ন কর্মসূচীতে। তার মুখ দিয়ে প্রার্থীর পক্ষে একবার কথা বলাতে পারলে তা ওই প্রার্থীর বিজয়ের সূচনা করে দিতো। তিনি ছিলেন তার শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রয়াত অ্যাডভোকেট আব্দুল গফফারকে তিনি বরাবর স্যার বলে সম্বোধন করেছেন। আহমদিয়া প্রেসের নিজ চেয়ারে বসে কর্মরত থাকার সময় অ্যাডভোকেট আব্দুল গফফারকে ইভিনিং ওয়াকের সময় দেখেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে স্যার বলে তাকে সালাম দিতেন এবং বলতেন একটু বসে যান একটু চা খেয়ে যান। তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে কখনও শত্রুতায় নামেননি। অনেক বিষয় নিয়ে বিতর্ক হতো। কর্মকর্তা জনগনের চাহিদা অনুযায়ী তার পক্ষে কাজ না করলে তিনি তাকে বদলি করার সুপারিশ করতেন এবং সেটা তার জন্য অত্যন্ত সহজ কাজ ছিলো। একারণে মহকুমা প্রশাসক, মহকুমা পুলিশ প্রশাসক এমনকি জেলায় উন্নীত হওয়ার পর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারগণ আব্দুল মোতালেবকে খুব বেশি চটাতেন না। তারা বরং তার সাথে সমন্বয় রেখেই যাবতীয় উন্নয়ন কাজগুলো করতেন।

তিনি তার সব ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে সমাজের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। আর তাকে এ ব্যাপারে সবসময় উৎসাহ যুগিয়েছেন তার প্রয়াত সহধর্মিনী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আমেনা বেগম। আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আব্দুল মোতালেবের মৃত্যু ঘটে সেই ২০ বছর আগে। তার মৃত্যুর পর সাতক্ষীরার মানুষ অঝোরে কেঁদেছে। তার কবরস্থানের মৃত্তিকা ছুয়ে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। আব্দুল মোতালেব নামের এমন প্রথিতযথা সাংবাদিক, সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী ও নারীশিক্ষার পথিকৃৎ সামাজিক নেতা আর দ্বিতীয়টি এখনও পর্যন্ত জন্মায়নি সাতক্ষীরায়। স্মৃতি তাই কখনও ভুলে থাকা যায় না। স্মৃতির ওপর ধূলোর আবরন পড়ে তবু মস্তিষ্কের সব ধমনীতে এই স্মৃতির সব চিত্রগুলি রয়ে যায়। ২০ বছর পর আজ সেই স্মৃতিই নতুন করে আবারও প্রতিভাত হয়ে উঠলো। তার প্রতি সাতক্ষীরাবাসীর বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: সাবেক সভাপতি, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব