স্মরন : চলে গেলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাশীদ উন নবী বাবু


155 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
স্মরন : চলে গেলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাশীদ উন নবী বাবু
জুলাই ১০, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

সুভাষ চৌধুরী

মারণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে অবশেষে হেরেই গেলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাশীদ উন নবী। ভারতের ভেলোরের ক্রিশ্চিয়ান মিশনারীজ হসপিটাল ও মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হসপিটালে দুই দফা চিকিৎসা গ্রহন শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরেছিলেন তিনি। এর পর থেকে কখনও ভালো কখনও খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে কাটছিল তার দিনগুলি। অবশেষে বুধবার রাতে ঢাকার পান্থপথের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন এই সাংবাদিক।

রাশীদ উন নবী বাবু ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় দৈনিক বাংলায়। আমি যখন দৈনিক বাংলার সাতক্ষীরা করেসপন্ডেন্ট তখন তিনি দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন। রাতে নিউজ ডেস্কে তিনি শিফট ইন চার্জেও থাকতেন। নবী ভাইয়ের মত আরও একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম, তিনিও ছিলেন শিফট ইন চার্জ। নব্বইয়ের দশকে তখনও ইন্টারনেট সুবিধা এবং কম্পিউটার সুবিধা বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল না। ফলে আমরা যারা ঢাকার বাইরে থাকতাম তারা চারটি মাধ্যমে নিউজ পাঠাতাম। এক. ডাকযোগে , দুই. টেলিগ্রাম করে, তিন. ফ্যাক্স করে ও চার. টেলিফোনের মাধ্যমে। প্রথম তিন প্রকারে নিউজ পাঠাতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সমস্যা হতো না। রাত হলে শেষ পর্যন্ত টেলিফোনে নিউজ পাঠাতে হতো। বিশেষ করে রাত নয়টার পরে টেলিগ্রাম করা যেতো না এবং ফ্যাক্সের দোকানও বন্ধ থাকতো। জরুরী কোন খবর আমাদের পাঠাতে হতো টেলিফোনে বুকিং দিয়ে। ওপার থেকে টেলিফোনে কেউ না কেউ এই খবর রিসিভ করে দ্রুততার সাথে নিউজটি হাতে লিখে নিতেন। পরে সেটি প্রেসে যেতো। আমার অভিজ্ঞতায় রাশীদ উন নবী বাবু ভাই ও আমিরুল ইসলাম দুজনেই এ ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। নিউজের বাক্য বলা শেষ হতে না হতেই বাবু ভাই লেখা শেষ করে ফেলতেন। মাঝেমধ্যে ধমক দিয়ে বলতেন, তাড়াতাড়ি বলুন। সত্যিই তাড়াতাড়ি বলার পরও পরদিন সকালে পত্রিকায় নিউজটি ছাপা হতো নির্ভুল বানানে ও নির্ভুল বাক্যে। তার মাধ্যমে নিউজ পাঠিয়ে সত্যি আমরা প্রীত হতাম। আমি ও যশোরের প্রয়াত শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবল দুজনেই এজন্য তার প্রতি খুব খুশী ছিলাম।

বাবু ভাই অত্যন্ত রাশভারী মানুষ ছিলেন। কথার মধ্যে গাম্ভীর্য ছিল। তার মধ্যে ছিল অগাধ পান্ডিত্যের ভান্ডার। আমরা ঢাকায় গেলে নিউজ টেবিলে বসে তার সাথে অনেকক্ষন আড্ডা দিতাম। এই বাবু ভাই ১৯৯৭ সালে দৈনিক বাংলা বন্ধ হয়ে গেলে বিভিন্ন স্থানে চাকুরি নেন। এর মধ্যে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক যুগান্তর, সাপ্তাহিক পূর্নিমা, দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক সকালের খবর ইত্যাদি রয়েছে। এরই মধ্যে এক পর্যায়ে ২০০৪ সালে জন্মলগ্ন থেকে এনটিভিতে যোগ দেন রাশীদ উন নবী বাবু। সেখানেই তার সাথে ফের দেখা। তিনি নিউজ এবং প্রশাসনিক দুই দিকেই সম্পৃক্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি সেখান থেকে চলে যান দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায়।

বাবু ভাই অত্যন্ত দক্ষ সাংবাদিক ছিলেন। তিনি নিজে যা লিখেছেন তার থেকে বেশী লিখিয়েছেন সাংবাদিকদের দিয়ে। ভালো ভালো রিপোর্টের ব্যাপারে তিনি যথাযথ পরামর্শ দিতেন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার জন্য তিনি উৎসাহ যোগাতেন। দৈনিক বাংলায় যে দুইজন মানুষ আমাদের খুবই প্রিয় ছিলেন তারা হলেন- খায়রুল আনোয়ার মুকুল এবং রাশীদ উন নবী বাবু। এই দুইজনেই এনটিভিতে থাকাকালীন আমাদের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে।

রাশীদ উন নবী বাবু অত্যন্ত পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। দ্রুততার সাথে নিউজ এডিট করতে পারতেন তিনি। এমন একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। বৃহস্পতিবার সকালে তার মৃত্যুর খবর এনটিভিতে দেখে আমার সেই পুরনো স্মৃতিগুলো উথলে উঠলো। ভারত থেকে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরেছেন, ভালো আছেন এই খবরটুকু জানতাম মাত্র। কিন্তু আকস্মিক মৃত্যুর খবর আসবে এমনটি শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমাদের সেই নবী ভাই আজ আর আমাদের কাছে নেই। তিনি চির নিদ্রায় শায়িত হলেন বগুড়া শহরের মালতী নগরে তার বাবার কবরের পাশে।

#

———সুভাষ চৌধুরী, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি ১০.০৭.২০