হতাশা আর মনো কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরেছে পাইকগাছার বৃক্ষ মানব আবুল বাজনদার


517 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
হতাশা আর মনো কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরেছে পাইকগাছার বৃক্ষ মানব আবুল বাজনদার
মে ৩১, ২০১৮ খুলনা বিভাগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

এস,এম,আলাউদ্দিন সোহাগ, পাইকগাছা ::
অবশেষে ব্যাপক হতাশা আর মনোকষ্ট নিয়ে চিকিৎসা শেষ না করেই বাড়ি ফিরে গেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন পাইকগাছার বৃক্ষ মানব আবুল বাজনদার। তার অভিযোগ,ঢাকা মেডিকেলে তার ঠিকমত চিকিৎসা হচ্ছিলনা। স্টাফদের চিকিৎসায় নিরুৎসাহিত ও দু’বেলা খেতে না পারার অভিযোগ থেকে শুরু করে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের ভয় দেখানোরও অভিযোগ করেন তিনি। হাসপাতাল কতৃপক্ষ অবশ্য দাবি করছেন যে,কাউকে না জানিয়ে পালিয়ে গেছেন আবুল। এক্ষেত্রে আবুলের অভিযোগ উল্টো যে,কতৃপক্ষ তাকে এশটি স্বেচ্ছা ছাড় পত্রে স্বাক্ষর করতে বলেছিল। যাতে নাকি লেখা ছিল,তিনি স্বেচ্ছায় হাসপাতাল ছাড়ছেন এবং তিনি আর চিকিৎসা করাতে চাননা।
আবুল জানান,গত দু’বছরে অন্তত ২৫ দফার অস্ত্রপচার হয়েছে তার শরীরে। এরপরও তার হাত ও পায়ের কিছু কিছু জায়গায় ফের আধা ইঞ্চির মত লম্বা শিকড়-বাকড়ের ন্যায় শ্বাসমূল গজিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তার চিকিৎসকরা তাকে জানান,সমস্যাটি মূলত জেনেটিক এবং সারা জীবন নাকি তাকে এটা বয়ে বেড়াতে হবে। আবুল বলেন,এর আগে চামচ দিয়ে তিনি খাবার উঠিয়ে খেতে পারছিলেন,সর্বশেষ সেটাতেও তার সমস্যা হচ্ছে। মূলত এসব কারণেই হাসপাতাল ছেড়েছেন বলে দাবি আবুলের। আবুল আরো জানান,২মার্চ হাসপাতাল ছেড়ে বাড়িতে এসে সর্বশেষ ১৫ মে হাসপাতালে ফিরলে হাসপাতালের দায়িত্বরতরা বিরক্তি প্রকাশ করেন।
এর আগে এক প্রতিবেদনে আবুলের হাত-পায়ে ফের গাছের শিকড়-বাকড়ের ন্যায় অদ্ভুত শ্বাসমূল বস্তু গজানোর বিষয়টি উঠে আসে। আর এতে নতুন জীবনে ডাক্তারদের পূণর্বাসনে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া আবুলের মনে নতুন করে নানা আশংকার কথাও প্রকাশ পায়। সেবার ১৬ বারের সফল অস্ত্রপচারে শরীরের ৫ কেজি ওজন কমেছিল তার। ডাক্তারদের উদ্বৃতি দিয়ে পুরনো দুস্মৃতিকে মনে পড়ে আবুলের। প্রতিবেদনে উঠে আসে বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন আবুলের আশংকার কথা,হয়তোবা বিরল ব্যধি আমৃত্যু পিছু ছাড়বেনা তার। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের হাত ধরে স্বাভাবিক চলাফেরার অভূতপূর্ব অনুভূতি বার বার আপ্লুত করছিল তাকে।
পাইকগাছা পৌরসভার সরল গ্রামের মানিক বাজনদারের ৪ ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে আবুল ৬ষ্ঠ। পারিবারিক সূত্র জানায়,১০ বছর বয়স থেকে সে বিরল রোগ হিউম্যান পাপ্পিলোমা ভাইরাসে (এইচপিভি) আক্রান্ত হলে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গাছের শিকড়ের ন্যায় লম্বা অংশ গজাতে থাকে। এক সময় চলাচল পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় তার। স্থানীয় পর্যায়ে নানা রকম চিকিৎসা করিয়ে সহায়-সম্বল ও সর্বশেষ বসত-ভিটা পর্যন্ত বিক্রি করে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে স্বজনরা তাকে নিয়ে ভ্যনে করে বাজারে বাজারে ভিক্ষা করে সংসারের খরচ ও স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় তাকে নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশে সরকারি তত্ত্বাবধানে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে।
চিকিৎসকরা জানান,বিশ্বে ওয়ার্ট রোগে আক্রান্তের সংখ্যা এখনও পর্যন্ত চারজন। এমন বিরল রোগ সাধারণত জিনগত কারণে হয়ে থাকে বলেই মনে করেন তারা। পাপ্পিলোমা ভাইরাস মানুষের শরীরে একশ উপায়ে আক্রমণ করতে পারে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশই যৌনাঙ্গে আক্রমণ করে থাকে। সব ধরনের এইচপিভি ভাইরাসের কারণে শরীরে আঁচিল হতে পারে।
এর আগে ডিএমসিএইচর বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক ডা.সামন্ত লাল সেন বলেন,এ ধরনের অসুখ বাংলাদেশে এই প্রথম এবং গোটা বিশ্বে বিরল। ইতোপূর্র্বে ২০০৭ ও ২০০৯ সালে মাত্র দু’জন এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এদের একজন ইন্দোনেশিয়া ও অপরজন রোমানিয়ান। এ ধরণের রোগীকে সাধারণত ‘বৃক্ষ-মানব’ বলা হয়ে থাকে। ২০১৫ সালে যে সময় আবুলকে ঢাকায় বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করা হয় তার সপ্তাহ খানেক পূর্বে ইন্দোনেশিয়ায় বিরল রোগে আক্রান্ত কসওয়ারা দেদে নামে একজনের মৃত্যু হয়। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে ঢাকার বার্ণ ইউনিটের (ডিএমসিএইচ) চিকিৎসকরা বাজানদারের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বোডের্র সফল অস্ত্রপচারে আবুলের সুস্থ্যতা গোটা চিকিৎসা জগতের বিরল সাফল্য এনে দিয়েছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ এন্ড প্লাস্টিক সার্জারী বিভাগের সমন্বয়ক ডাঃ সামন্ত সাংবাদিকদের সর্বশেষ পরিস্থিতিতে আবুলের চলে যাওয়া নিয়ে বলেন,কে তার সাথে খারাপ আচরণ করেছিল কিংবা তার সমস্যাগুলো ঠিক কোথায় তা সে তাকে জানাতে পারতো বলেও আক্ষেপ করেন।
এর আগে দু’দিনের জন্য বাড়িতে আসা আবুল বাজনদার তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিলেন,অসুস্থ্য অবস্থায় অসহ্য যন্ত্রণা হত আক্রান্ত স্থানে। একমাত্র ঠিকানা ভ্যান গাড়িতে শুয়ে কখনও তার ভাবা হয়নি নতুন জীবনে ফেরা আর। তবে দু’বছরের চিকিৎসার পর ফের একই সমস্যায় আক্রান্ত নিয়ে তার আশংকা ছিল,দুঃসহ যন্ত্রণা কি তবে ফের থাবা বসাবে তার জীবনে? নতুন করে হাত-পায়ের আঙুলগুলো কি ঢেকে যাবে অদ্ভুত শিঁকড়ে? এমন আশংকায় আবুল ও তার পরিবারে নিত্য নতুন ভবনার জন্ম দিচ্ছিল।
অন্যদিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মেডিকেল টিমের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডঃ কবির চৌধুরী জানতে পারেন যে,আবুলের বসবাসের জন্য কোন জায়গা নাই। এরপর তিনি জমি কিনে বাড়ি করার জন্য আবুলকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন। চিকিৎসকের আর্থিক সহায়তায় আবুল ২০১৬ সালের জুনে পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের সরল মৌজায় শিক্ষক মাখন লাল গংদের নিকট থেকে ২টি কোবলা দলিল মূলে এস,এ ৬৩০ দাগ সহ ভিন্ন দাগে প্রায় ১১ শতক জমি ক্রয় করে কোন রকমে বসত বাড়ি নির্মাণ করে সেখানে গত ৩ মাস ধরে বসবাস শুরু করছেন তার পরিবার। তবে বাড়ির কোন যাতায়াতের পথ না থাকায় পরিবার-পরিজনের অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার খবওে পাইকগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) আমিনুল ইসলাম বিপ্লবকে বিষয়টি অবহিত করলে তার হস্তক্ষেপে দখলমুক্ত হয় রাস্তাটি। দেশের একমাত্র বিরল রোগে আক্রান্ত ভ্যান চালক আবুলের প্রতি তার চিকিৎসকদের যখন ছিল এমন ভালবাসা ও হৃদ্রতায় ঠাঁসা তখন কি এমন ঘটল যে,রাতারাতি চিকিৎসা শেষ না করেই এক প্রকার পালিয়ে চলে আসতে বাধ্য হল আবুল? এমন প্রশ্নের সঠিক হিসেব মেলাতে পারছেননা এলাকাবাসীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্তরের মানুষ।
সর্বশেষ যন্ত্রনায় কাতর আবুলের করুণ আকূতি,তিনি উন্নত চিকিৎসা পেলে পুরোপুরি ভাল হয়ে উঠবেন। তবে আর ঢাকা মেডিকেলে নয়।