হারিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের বাঘ


906 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
হারিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের বাঘ
আগস্ট ৯, ২০১৬ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর সুন্দরবন
Print Friendly, PDF & Email

জাকির হোসেন মিঠু :
সুন্দরবন থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে বাঘ। বনে এখন আর বাঘের গর্জন শোনা যায় না। বাঘের আনাগোনাও চোখে পড়ছে না।  এমনকি শিকার ও মিষ্টি পানির খোঁজে বাঘ লোকালয়ে  আসছে কমই। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা এলাকায় বাঘের কবলে পড়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেনি দীর্ঘদিন।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের বনজীবিরা  জানান তারা বনে কাজ করতে যেয়ে বারবার বাঘের দেখা পেয়েছেন তারা বাঘের কবলে পড়ে তাদের অনেক সঙ্গী প্রাণ হারিয়েছেন। বাঘের ভয়ে জঙ্গলে যেতে আতংকিত থাকতেন। মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ,কাঠ কাটা , গোলপাতা কাটা , মাছ ধরা এসন সব কাজ করার সময় পাহারায় লোক রাখতে হতো। এখন বনের গভীরতা কমে গেছে। বাঘ দিন দিন হারিয়ে ফেলছে তার  নিরাপদ আস্তানা। বন থেকে বাঘের ভয় কমে গেছে।
শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউপি সদস্য  মো.নুরুজ্জামান বলেন অনেকে বনে তো সব সময় যাই। কিন্তু বাঘ চোখে দেখিনা। তবে এখানে বাঘ আছে জানতাম।  তাই ভয়ে ভয়ে বনে থাকতাম। নৌকায় রাত কাটাতাম ভয়ে ভয়ে । পালা করে পাহারা দিতাম আমরা ।
এখন আর সেই  বাঘের দেখাও মেলে না।  গর্জনও শুনতে পায়না স্থানীয়রা। সুন্দরবনের গোলাখালি, বনবিবিতলাসহ কয়েকটি এলাকায় বাঘ ও বাঘিনী প্রজনন ক্রিয়ার জন্য আসা যাওয়া করতো। এখন তাও আর দেখা যায়না ।
শ্যাামনগর উপজেলার কৈখালি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো.রেজাউল ইসলাম  জানান, কয়েকদিন আগে চুনা নদীর ওপারে একটি বাঘের আনাগোনার খবর পাওয়া যায়। তবে তার সন্ধান পাইনি আমর্ া। এখন আর দেখিনা কোনো বাঘ। সুন্দরবনের কলাগাছি ফরেস্ট স্টেশনের মিষ্টি পানির পুকুরে বাঘ পানি খেতে আসতো আগে। অনেকদিন যাবত আর দেখা যায়নি।
শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার বনজীবি আতিয়ার রহমান মল্লিক  জানান, সুন্দরবনের পাশে বসবাস কারীরা জানান সন্ধ্যা হতেই  গা ছম ছম করতো। কখন না বাঘ আসে । বাঘ নদী পার হয়ে সহজেই আসতে পারে।  এখন আর বাঘের ভয় নেই । আছে বন ডাকাতের ভয়। একাধিক বনদস্যুদল আত্মসমর্পন করলেও বনে এখনও বেশ কয়েকটি ছোট ছোট বাহিনী রয়েছে। তারা এখনও বনে নানা ধরনের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। বনে বাঘ যখন বেশি ছিল তখন বনদস্যুও কম ছিল । এখন বাঘ নেই, তাই সুন্দরবনে বনদস্যুরা সহজে দাপিয়ে বেড়ানোর সাহস করে ।
শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার জেলে বিনয় মন্ডল ও  আন্ধারিবালা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের পানিতে অধিক লবনাক্ততার প্রভাব পড়ছে। স্বাদু পানির অভাবে বাঘ রোগগ্রস্থ হয়ে পড়ে । তাদের লিভার সিরোসিসের মতো রোগ দেখা দেয়।   ফলে অকালে বাঘের মৃত্যু ঘটে। বনে  বাঘের খাবারের দারুন অভাব । বাঘের প্রধান শিকার শুকর। কিন্তু সুন্দরবনে শুকর না থাকায়  শিকারের খোঁজে নদী সাঁতরে লোকালয়ে আসে বাঘ। এরপর তার ভাগ্যে জোটে গনপিটুনি।  এরকম ঘটনায় সাতক্ষীরায় এতোদিনে ১২টি বাঘ গনপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছে।  এ ছাড়া বাঘের কবলে পড়ে এ এলাকায় প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটতো। গত তিন বছর যাবত পশ্চিম সুন্দরবন এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেনি।
শ্যামনগরের গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান আলি আজম টিটো জানান, বনে যারা চোরা শিকারী তারা  বাঘ হত্যা করে এর চামড়া , নখ , দাঁত চোরাপথে আন্তর্জাতিক বাজারে  বিক্রি করে দেয়। এ জন্য বড় বড় চক্র গড়ে উঠেছে।  ২০১২ সালের জুন মাসে  সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের গভীর জঙ্গলে  এক বাঘিনীকে হত্যা করে তার তিনটি শাবক চুরি করে চোর শিকারীরা। কয়েকদিন পর ঢাকার শ্যামলীতে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব শাবক তিনটি উদ্ধার করে। এ ঘটনায় জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। সে সময় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ভেটখালি গ্রামের নুরুজ্জামান মেম্বর , হযরত আলি, নান্টুসহ বেশ কয়েক জনের নামে মামলা হয়। তাদেরকে বনে প্রবেশ নিষেধ করা হয়। এই চক্রটির সাথে আরও কিছু চোর শিকারী জড়িত রয়েছে বলে গ্রামবাসী জানিয়েছেন। তাদেরকে চিহ্ণিত করতে পারলে বনের বাঘ রক্ষা পেতো ।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম জানান ,বাঘ রক্ষায় আমরা সব সময় সচেতন। বন্যপ্রাণি হত্যা ও বনজ সম্পদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে আমরা সচেতনতা গড়ে তুলেছি। বিভিন্ন সময়ে এ এলাকার গ্রামে  বাঘ উঠে এলে তার পরিনতি হয় গনপিটুনিতে মৃত্যু। চেষ্টা করেও গনরোষ থেকে তাকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।  গুলি করে , ফাঁদে আটকে , এমনকি চিটাগুড়ের সাথে চেতনানাশক পদার্থ মিশিয়ে চোর শিকারীরা বনের বাঘ হত্যা করে থাকে। ১৯৮৮ এর প্রলয়ংকরী ঘুর্নিঝড়, ২০০৭ এর ভয়াল সিডর এবং ২০০৯ সালের এর ভয়ংকর আইলার আঘাতে  বেশ কয়েকটি বাঘ প্রাণ হারায় ।
রমজাননগর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আকবর আলি গাজি জানান, বাঘ হত্যা কেনো হরিন কিংবা বন্যপ্রাণিকে যারা হত্যা করে তারা দেশের শত্রু। কারণ বাঘ আছে তাই বন আছে। আর বন আছে বলেই আমরা অনেক দুর্যোগ  থেকে রক্ষা পাচ্ছি বন্য প্রাণি বিশেষকরে বাঘ ও হরিন রক্ষা এবং এসব প্রাণি হত্যাকারীদের গ্রেফতার দাবিতে সুন্দরবন সংলগ্ন পাঁচটি ইউনিয়নের গ্রামবাসী মানববন্ধন করেছেন।
সাতক্ষীরা শ্যামনগর ৪ আসনের সংসদ সদস্য এসএম জগলুল হায়দার জানান , আমরা বাঘ শিকারিদের আইনে সোপর্দ করেছি। যেসব চোরাশিকারী জড়িত রয়েছে তাদেরকে আমরা হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছি তারা আইনের হাত থেকে রক্ষা পাবেনা। জাতীয় সংসদে এ ব্যাপারে কথা বলেছি। বন বিভাগও বনের বাঘ হরিণ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। তারা সকলকে সচেতন হবার আহবান জানিয়েছেন।
সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিসার এসএম শোয়েব হোসেন জানান, পশ্চিম সুন্দরবন এলাকায় বাঘ হত্যার ঘটনা খুবই কম। তবু আমাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে। এর সাথে জড়িতদের রক্ষা নেই।