হিট লিস্টে ৮৪ ব্লগার, তালিকা ধরে খুন


874 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
হিট লিস্টে ৮৪ ব্লগার, তালিকা ধরে খুন
আগস্ট ৯, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভেয়স অব সাতক্ষীরা ডটকম :
ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করার অভিযোগে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ব্লগারদের একাধিক তালিকা প্রকাশ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ৮৪ জনের হিট লিস্ট।

তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ হলো, লিস্টগুলোতে যাদের নাম ছিল তাদের কয়েকজনকে খুন করেছে উগ্রপন্থীরা। প্রতিটি খুনের ঘটনার পর অনলাইনে বিভিন্ন সংগঠনের পরিচয়ে এর দায়ও স্বীকার করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ সরকার আইন, তথ্য ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা নিয়ে নয় সদস্যের একটি কমিটি করে। এ কমিটির কাজ ছিল পবিত্র ইসলাম ধর্ম ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যকারীদের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কাছ থেকে তথ্য নেওয়া।

বিভিন্ন মহল থেকে সব মিলিয়ে ৮৪ জন ব্লগারের একটি তালিকা কমিটির কাছে আসে। ৩১ মার্চ ধর্ম নিয়ে ‘কটাক্ষকারী’ ব্লগারদের একটি তালিকা দেয় হেফাজতে ইসলাম। আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত নামে আরেকটি সংগঠন ৫৬ জনের একটি তালিকা দেয়। জামায়াত-শিবির পরিচালিত একটি ফেসবুক গ্রুপ ‘বাঁশের কেল্লা’ ৮৪ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টের একটি তালিকা প্রকাশ করে।

একই বছর অক্টোবর মাসে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান পরিচয় দেওয়া মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীকে গ্রেফতারের পর মোহাম্মদপুরে তার কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে ৮৪ জনের নামের একটি তালিকা পায় পুলিশ। এ তালিকার সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের তালিকার মিল ছিল। পরে মুফতি জসীম উদ্দিনকে ব্লগার রাজিব হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

‘হিট লিস্ট’ অনুসারে খুনের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এ ঘটনাগুলোতে এখন পর্যন্ত তদন্তের তেমন কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি। মামলার মতো মামলা হচ্ছে কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি হচ্ছে না।

এ সকল ঘটনার মধ্যে শুধু ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যায় অংশ নেওয়া দুজন ছাড়া আর কাউকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাও এ ঘটনায় যে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের জনসাধারণ বিশেষ করে একজন হিজড়া সহায়তা করেছিলেন।

এমনকি লিস্টে যাদের নাম রয়েছে তাদের নিরাপত্তার জন্যও তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তালিকাটি থাকলেও ব্লগারদের নিরাপত্তায় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। তালিকায় থাকা অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। যারা যাননি, তারা আছেন আতঙ্কে।

সংগঠনগুলোর দেওয়া এ তালিকাগুলোতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক অভিজিৎ রায়, মুক্তমনা ব্লগের আরেক ব্লগার, লেখক ও ব্যাংকার অনন্ত বিজয় দাশ, গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট আহমেদ রাজিব হায়দার শোভন এবং নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়ের নাম ছিল। তবে অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবুর নাম এ লিস্টে ছিল না।

তালিকায় থাকা অন্য ব্লগার হলেন— দূরের পাখি, রাস্তার ছেলে, আরিফুর রহমান, মনির হাসান, বৃত্তবন্দি, সবাক, শয়তান, মনজুরুল হক, কখগ, রাসেল, নাস্তিকের ধর্মকতা, আরিফুল হক তুহিন, তিতি আনা, নাজিম উদ্দিন, আলমগীর কুমকুম, ফরহাদ উদ্দিন স্বপন, দস্যু বনহুর, ফারহানা আহমেদ, ঘনাদা, রাহান, অন্যকেউ, পাপী০০৭, হোরাস, প্রশ্নোত্তর, ভালোমানুষ, ভুপীর, বৈকুণ্ঠ, সত্যান্বেষী, পড়ুয়া, হাল্ক (সানাউল), বিপ্লব০০৭, ঘাতক, বিশাল বিডি, সাহোশি ৬, লাইটহাউজ, মমতা জাহান, রাতমজুর, কৌশিক, মেঘদূত, স্বপ্নকথক, প্রায়পাস, আহমেদ মোস্তফা কামাল, লুকার, নুহান, সোজাকথা, ট্রানজিস্টার, দিওয়ান, রিসাত, আমি এবং আধার, অরণ্যদেব, কেল্টুদা, আমি রোধের ছেলে, ভিন্ন চিন্তা, আউটসাইডার, প্রণব আচার্য্য, আসিফ মহিউদ্দিন, আবুল কাশেম, আলমগীর হোসেন, আশীষ চ্যাটার্জি, বিপ্লব কান্তি দে, দাঁড়িপাল্লা ধমাধম (নিতাই ভট্টাচার্য), ইব্রাহীম খলিল সবাগ (সুমন সওদাগর), কৌশিক আহমেদ, নুরনবী দুলাল, পারভেজ আলম, রতন (সন্ন্যাসী), সৈকত চৌধুরী, শর্মী আমিন, সৌমিত্র মজুমদার (সৌম্য), আল্লামা শয়তান (বিপ্লব), শুভজিৎ ভৌমিক, সুমিত চৌধুরী, সৈকত বড়ুয়া, সুব্রত শুভ, সুশান্ত দাস গুপ্ত, সৈয়দ কামরান মির্জা, তাহসিন, তন্ময়, তালুকদার ও জোবায়ের সন্ধি।

ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনের ওপর ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি হামলা করা হয়। রাজধানীর উত্তরায় কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ধারণা করা হয়, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর মদদেই এ হামলা করা হয়।

সর্বশেষ ৭ আগস্ট শুক্রবার দুপুরে গোড়ানের বাসায় খুন হন নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়।

ডিএমপি’র গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম-কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে জানান, টার্গেট অনুসারে হত্যাকারীরা নীরবে এ সকল মুক্তচিন্তার মানুষকে হত্যা করে চলেছে, যা উদ্বেগজনক। তাই হত্যাকারীদের সঠিকভাবে শনাক্ত করতে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে একটি বিশেষ ইউনিটের প্রয়োজন। আশা করছি বিশেষ ইউনিট শিগগিরই গঠন করা হবে।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (ডিসি, মিডিয়া) মুনতাসিরুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘প্রতিবার ব্লগার হত্যার পর অনলাইনে একটি সংগঠন দায় স্বীকার করে। ওই সংগঠনের কোনো অস্তিত্ব আছে কিনা, তা তদন্ত করা হচ্ছে। এবার এ সংগঠনের ব্যাপারে জোরালোভাবে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। আসলে এ রকম কোনো সংগঠন থেকে বিবৃতি দেওয়া হয় নাকি অন্য কেউ সংগঠনের নাম ব্যবহার করে এমন বিবৃতি পাঠায় সে ব্যাপারে তদন্ত করা হচ্ছে। তালিকার ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পুলিশের সব শাখা মাঠে কাজ করছে। আশা করি খুব শিগগির হত্যাকারীরা গ্রেফতার হবে।’

তিনি আরও জানান, অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টদের হত্যাকারীরা গ্রেফতার হচ্ছে না এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। ব্লগার রাজিব হত্যার খুনিরা ধরা পড়েছে। ওয়াশিকুর হত্যায় অংশ নেওয়া দুজন ধরা পড়েছে। তাদের বিচার কাজ চলছে। বাকিদের ব্যাপারে তদন্ত শেষ হয়ে যায়নি। তারাও ধরা পড়বে।

গোয়েন্দা সূত্রে আরও জানা যায়, রাজীব হায়দার হত্যার পর থেকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ৯টি ব্লগের ওপর নজরদারি শুরু করে। এগুলো হল- মুক্তমনা, স্যামহোয়ার, আমার, নাগরিক, ধর্মকারী, নবযুগ, সচলায়তন, চুতরাপাতা ও মতিকণ্ঠ ব্লগ। তালিকাগুলোতে যাদের নাম রয়েছে তাদের অনেকেই ছদ্মনামে পরিচিত। কিন্তু তাদের প্রকৃত পরিচয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কাছে অজানা নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বিশিষ্ট নাগরিকদের হত্যার হুমকি ও ব্লগার হত্যার ঘটনা রহস্যজনক। অনুসন্ধান শেষে আমরা বলতে পারব কারা এ সব ঘটনার সঙ্গে জড়িত। যেহেতু হুমকি দেওয়া হচ্ছে, সেহেতু বিশিষ্ট নাগরিকসহ বাকিদের নিরাপত্তার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’