হেফাজতে মামুনুল কেন প্রভাবশালী


79 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
হেফাজতে মামুনুল কেন প্রভাবশালী
এপ্রিল ২২, ২০২১ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

খতিয়ে দেখা হচ্ছে অঢেল সম্পদের উৎস

অনলাইন ডেস্ক ::

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক সংগঠনটিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত। সংগঠনটির অনেক সিদ্ধান্তে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। হেফাজতের বর্তমান কমিটির অনেকে তাকে কার্যত ‘তোয়াজ’ করে চলেন বলে জানা গেছে।
রিমান্ডে থাকা মামুনুলসহ একাধিক হেফাজত নেতার কাছ থেকে তার প্রভাব বলয়ের কারণ খুঁজছেন গোয়েন্দারা। এসব নেতা জানান, হেফাজতে শুরু থেকেই দুটি ধারা রয়েছে। এক ধারার নেতারা আল্লাহ-রাসুলের (সা.) তরিকা অনুযায়ী নিরিবিলি জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তারা কোনো কর্মসূচিকে ঘিরে নাশকতা ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে। হেফাজতের আরেক দলের নেতারা ধর্মের অপব্যাখ্যা, কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য ও বিতর্কিত রাজনৈতিক মন্তব্য করে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ান। এই গ্রুপটির সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের কোনো কোনো নেতার ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেকে হেফাজতের আড়ালে নিজেরাই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে।
তারা বলছেন, হেফাজতের উগ্রপন্থি এ গ্রুপটির নেতা হিসেবে অনেক দিন ধরেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মামুনুল। কোনো কর্মসূচির ডাক দেওয়া হলেই মামুনুল তা ঘিরে জল ঘোলা করে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার পাঁয়তারা চালান। হেফাজতের একটি অংশ তাকে এতে সহযোগিতা করে আসছে। তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে এসব তথ্য জানান।
২০২০ সালে মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা একটি মামলায় মামুনুলকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ সমকালকে বলেন, ২০১৩ সালের পর ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনা ছাড়াও নানা সময় বিতর্কিত মন্তব্য করে আসছিলেন মামুনুল। সরকার পালানোর পথ পাবে না- এমন হুমকিও দিয়েছিলেন। নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে দেওয়া কর্মসূচিতেও উগ্র আচরণ করেন তিনি। কারা পেছন থেকে তার এসব বিতর্কিত কর্মকাে ইন্ধন জোগাত, তাদের খুঁজে বের করা হবে।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত আরেকজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শাপলা চত্বরের মঞ্চ থেকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের নাম ধরেই হুমকি দেন মামুনুল। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ওয়াজ ও হেফাজতের অন্যান্য কর্মসূচিতে মামুনুলই প্রথম নানা ইস্যুতে বিতর্কের জন্ম দিতেন।
কেন তিনি বারবার এমন উগ্র ভাষণ দিতেন- এমন প্রশ্নে মামুনুল গোয়েন্দাদের জানান, সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে ‘জনপ্রিয়’ হওয়ার ইচ্ছা তার ছিল। আবার অনেক সময় নিজেই জোশের বশে বলে ফেলতেন। তার ভাষ্য, হেফাজত নয়, খেলাফতে মজলিসের নেতা হিসেবে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতেন তিনি।
সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির শাহ আহমদ শফীর আমলেও মামুনুলের তেমন প্রভাব ছিল না। তবে শফীর মৃত্যুর পর কার্যত সংগঠনটিকে ‘হাতের পুতুলে’ পরিণত করেন তিনি। এর অন্যতম কারণ মামুনুলের সঙ্গে হেফাজতের বর্তমান আমির জুনায়েদ বাবুনগরীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আবার হেফাজতের বর্তমান কমিটির অনেক সদস্যও মামুনুল-ঘরানার।
হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, হাবিবুল্লাহ আজাদী, মনির হোসেন, জুনায়েদ আল হাবিব, খালেদ, নাসির উদ্দিন মনির, সাখাওয়াত হোসেন, আতিকুল্লাহ, মোহাম্মদ জালাল প্রমুখের সঙ্গে মামুনুলের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ রয়েছে বলে জানা গেছে। বাবুনগরীসহ সংগঠনটির প্রভাবশালী অনেকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে একাধিক কথিত বিয়েকাণ্ড ফাঁস হওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়নি হেফাজত।
চলমান ইস্যু নিয়ে হেফাজত নেতাদের বৈঠকে দু-একজন নেতা মামুনুলকাণ্ডের বিষয়টি আলোচনায় আনলেও বাবুনগরীর হস্তক্ষেপে তা বেশি দূর এগোয়নি। এমনকি শুরুর দিকে মামুনুলের সমর্থনে একাধিক বক্তৃতা ও বিবৃতি প্রকাশ এবং সংবাদ সম্মেলন করেছে হেফাজত। তবে বিতর্কিত এই নেতা যখন স্বীকার করেন সব ফোনালাপ তারই ছিল- তখন কৌশলী ভূমিকা নিয়ে ‘ব্যক্তিগত ব্যাপার’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন সংগঠনটির নেতারা। তবে মামুনুলকে নিয়ে হেফাজতের কারও কারও মধ্যে চরম অস্বত্বি কাজ করছে।
হেফাজতের কর্মকাে র ব্যাপারে খোঁজ রাখেন এমন এক কর্মকর্তা জানান, পারিবারিক প্রভাবকেও মামুনুল হক হেফাজতের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করেছেন। তার বাবা আজিজুল হক খেলাফত মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা। মামুনুলের বড় ভাই মাহফুজুল হক বেফাকুল মাদ্রাসিল আরাবিয়ার মহাসচিব। তিনি মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া ও আরাবিয়া মাদ্রাসারও প্রধান।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, হেফাজতের নেতৃত্বের যে অংশটির রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হওয়ার উচ্চাভিলাষ রয়েছে, তাদের নেতৃত্বেও রয়েছেন মামুনুল। সংগঠনের অনেক কর্মসূচিতে কৌশল নির্ধারণে তার একক ভূমিকা ছিল। আবার অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ায় হেফাজতের ভেতরেও তাকে আলাদাভাবে দেখা হতো। এখন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি তার সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখছে। সম্পদের হিসাবে গরমিল পেলে তাকে মানি লন্ডারিং আইনের মামলারও মুখোমুখি হতে হবে।
হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম মহাসচিব মাইনুদ্দীন রুহী বলেন, ‘বাবুনগরীর কমিটিকে অনেকে মামুনুলের পকেট কমিটি হিসেবে অভিহিত করে। এখানে মামুনুলের খাস লোক রয়েছে ৪০-৫০ জন। মামুনুল ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা বর্তমান হেফাজতকে জিম্মি করে রেখেছে। আজ তারা ২০ হাজার কওমি মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীকে সরকার ও বুদ্ধিজীবীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আহমদ শফী বেঁচে থাকতেও তার বিরুদ্ধে কামরাঙ্গীরচর ও বারিধারায় গোপন বৈঠক করে ষড়যন্ত্র করেছিল মামুনুল।’