১৭ আগস্ট : কলঙ্কের আরেক ইতিহাস


395 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
১৭ আগস্ট : কলঙ্কের আরেক ইতিহাস
আগস্ট ১৭, ২০১৮ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

মো. আনিসুর রহিম ::
আগস্ট মাসে আমাদের বাঙালি জাতির জীবনে নানাভাবে কলঙ্কের ইতিহাস গড়ে উঠেছে। ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের উপর নৃশংস হামলা এবং বাংলার ইতিহাসে সব থেকে বড় ট্রাজেডিপূর্ণ ঘটনা ১৯৭৫ সালে ঘটে যায়। ১৭ আগস্ট ২০০৫ সালে জেএমবি দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে পাঁচ শতাধিক জনাকীর্ণ এরাকায় বেলা ১১টায় সিরিজ বোমা হামলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত করার ঘোষণা দেয় তাদের প্রচারপত্রের মাধ্যমে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলার ঘটনা দেশ ও জাতিকে স্তম্ভিত আর কলঙ্কিত করেছিলো।
আজ ১৭ আগস্ট। ২০০৫ সালের এই দিনে সাতক্ষীরা জেলার ৫টি জনাকীর্ণ স্থানে রিমোর্ট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বিকট আওয়াজে একই সময়ে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিলো। ভূষির প্যাকেটে জেএমবির ৩০-৪০ খানা করে প্রচারপত্র আর স্প্রিন্টারহীন বোমা ফাটিয়ে দেশবাসিকে জানানো হয়েছিল; ‘প্রচলিত আইন নয়, একমাত্র আল্লাহর আইনেই বাংলাদেশ শাসিত ও পরিচালিত হবে।’
শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে বাকশিস’র একটি সমাবেশ চলছিলো। সমাবেশ শেষে জেলা প্রশাসনের দপ্তরে গিয়ে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি ছিলো। হঠাৎ করে সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে রাজ্জাক পার্কের উত্তর-পূর্ব কোণায় বিস্ফোরণের শব্দে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো। প্রচন্ড ধোঁয়া উপেক্ষা করে ছুটে গেলাম। বারুদের গন্ধে চোঁখ, নাক, মুখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। দেখলাম, কারো কোনো ক্ষতি হয়নি। লিফলেট হাতে নিয়ে দেখলাম। পরপরই বিস্ফোরিত এলাকায় অন্য কাউকে হাত দিতে নিষেধ করলাম। এরপর সদর থানার ওসি, এনএসআই’র ডিএডিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের কাছে ফোনে খবর দিলাম। ১৭ আগস্ট ওসি সেদিন স্টেশনে ছিলেন না। তারপর পুলিশ ও এনএসআই’র লোকজন চলে আসলে আমি আমার দায়িত্ব শেষ মনে করে বাকশিস নেতৃবৃন্দের মাঝে চলে এলাম। খবর পেলাম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই রকম বোমা হামলা হয়েছে।
৫ থেকে ৭ মিনিট অতিবাহিত হতে না হতেই বাঁকাল ইসলামপুর গ্রামের শেখ রওশন আলী (যাকে এলাকার মানুষ পকেটমার বলে জানে) ছুটে আমাকে হাত ধরে টানতে লাগলো। তার চোখে মুখে ভয়ানক আতঙ্ক। শরীর কাঁপছিলো। যত বলি কী হয়েছে? তত বলে, আমি আর বাঁচবো না। এদিকে সরে আসেন। বাধ্য হয়ে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে যা শুনলাম তার মর্মকথা হলো: পুরাতন জজ কোর্টে কে বোমা ফাটিয়েছে তা আমি দেখেছি। নাছির দফাদার আমাকে চেনে। আমার বাড়ির পাশে বাড়ি। ও দেখে ফেলেছে আমাকে। ওরা আমাকে আর বাঁচতে দেবে না। এখন আমার কী হবে?….আমি কোথায় পালিয়ে থাকবো…?
বাঁকাল ইসলামপুর চরভরাটি গ্রামে রওশন আলী আর নাছির দফাদার পাশাপাশি বাস করে। গ্রামের সিদ্ধান্ত: ‘রওশন যেহেতু পকেটমার, সেহেতু সাতক্ষীরা শহরের টার্মিনাল ও কোর্ট এলাকায় রওশনের যাওয়া নিষেধ। যদি তাকে কোর্ট বা টার্মিনাল এলাকায় দেখা যায়, তাহলে রওশনকে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করা হবে।’
রওশনের কয়েকদিন আয় রোজগার ছিলো না। একইসাথে পুরনো অভ্যাসবশত: নিজের অজান্তে পুরাতন জজ কোর্টে চলে যায়। ভীড়ের ভিতর দাঁড়িয়ে ছিলো। হঠাৎ প্রতিবেশি নাছির দফাদারের সাথে দেখা হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে সালাম বিনিময় করে। নাছির দফাদার জিজ্ঞাসা করে, ‘রওশন তুই কোর্টে কেন?’ রওশন বলেছিলো, ‘আমার আত্মীয়ের এখানে আসার কথা। তাকে খুঁজছি। এখনই চলে যাবো।’ রওশন এবার জিজ্ঞাসা করে, নাছির ভাই! তোমার এখানে কী কাজ? কোনো মামলা আছে নাকি? তোমার হাতের থলেতে কী? সংক্ষিপ্ত আলাপের পর রওশন সরে পড়ে। কিন্তু নজর তার নাছির দফাদারের দিকে। সে তাকে দেখছে কী-না?
একটু আনমনা হতেই বিকট আওয়াজে বিস্ফোরণ। রওশন গিয়ে দেখে কারো কিছু হয়নি। নাছির দফাদারের নতুন থলেটি ছিন্নভিন্ন হয়ে ধোয়া উড়ছে। নাছির দফাদারের হাতের থলেটি বিস্ফোরণ হয়েছে। তাই নাছিরই ঘটনা ঘটিয়েছে বুঝে মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে আসে আমার সাতক্ষীরা প্রি-ক্যাডেট স্কুলে। স্কুলে না পেয়ে রাজ্জাক পার্কে আমাকে পেয়ে ঘটনা বর্ণনা করে।
আমি আশেপাশে এনএসআই স্টাফ জামান সাহেবকে পাই। তাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনার ডিএডি সাহেব কোথায়? এরপর আমি মোবাইল ফোনে জরুরীভাবে অফিসারকে আসতে বলি।
বাকশিস সমাবেশ ছেড়ে এনএসআই ডিএডি সাহেবের জন্য প্রতীক্ষা করছি। কিছুবাদে তিনি আসলেন। সাতক্ষীরা প্রি-ক্যাডেট স্কুল তখন রাজ্জাক পার্ক সংলগ্ন ছিলো। সাতক্ষীরা প্রি-ক্যাডেট স্কুলে আমার কক্ষে দরজা বন্ধ করে সব কথা খুলে বললাম। তিনি সরাসরি রওশনের সাথে কথা না বলে ঢাকা বা খুলনায় জানাতে চাইলেন না। আমি বললাম, তাকে পেতে হলে তার বাড়ি ইসলামপুরে যেতে হবে। একইসাথে নাছিরউদ্দিন দফাদারের বাড়ি চিনে আসা যাবে। আমি ছবি আঁকা বইয়ের একটি রঙিন পৃষ্ঠা ছিড়ে পকেটে ভরলাম। বললাম, নাছির দফাদারের বাড়ির সামনে পৃষ্ঠাটি ছিড়ে ছিটিয়ে আসতে হবে। পরে পুলিশকে যেনো চিনতে অসুবিধা না হয়। তখন আমাদের পরিবারের লাল টয়োটা প্রাইভেট কার ছিলো। ড্রাইভার বাবলুকে ছুটি দিয়ে আমি ও ডিএডি সাহেব প্রথমে পেট্রোল পাম্প ও পরে বাঁকাল ইসলামপুরে পৌছুলাম। এর ভিতর চারিদিকে পুলিশী তল্লাশি শুরু হয়ে গিয়েছে। বাঁকালে পুলিশ গাড়ি থামালে পরিচিত অফিসার বললেন, তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বাড়ি ফিরে যান…। সব গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে দেখে ভাল লাগলো। আমাদের প্রাইভেটকার ব্রীজের কিছু আগে বাবলাতলায় রেখে রওশনের বাড়ি গেলাম। নাছিরের বাড়ি চিনলাম। এরপর আমার দায়িত্ব শেষ করে এনএসআই ডিএসডি সাহেবকে নিয়ে সাতক্ষীরা শহরে ফিরলাম।
জেলা প্রশাসক মহোদয় বিকাল সাড়ে ৩টায় জরুরিভাবে বিশেষ আইন শৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে থাকার জন্য পত্রিকা সম্পাদক হিসেবে চিঠি পেয়ে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে হাজির হলাম। টানটান উত্তেজনা। প্রায় সকল এমপিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা চলছে। ইতোমধ্যে অতি গোপনীয় পদ্ধতিতে এসএসপি সার্কেল দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর নেতৃত্বে সফল অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। নাছির দফাদারের স্বীকারোক্তি মোতাবেক আরও দুজনকে গ্রেপ্তারের অপারেশন চলছিল। আমার কাছে সঙ্গত কারণে এ বিষয়ে আইডেট খবর আসছিল।
আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিএনপি-জামায়াতের এমপিগণ এবং জামায়াতের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সকলে এক বাক্যে-উচ্ছ্বসিতভাবে ভারতের ষড়যন্ত্র এবং বিরোধীপক্ষ বর্তমান সরকারেক অকার্যকর ও ব্যর্থ সরকার হিসেবে প্রমান করার জন্য দেশে সিরিজ বোমা হামলার মতে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে বলে সভা গরম করে ফেলছিলেন। আমি সভার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এটিএন বাংলার কামরুজ্জামানকে মোবাইল ফোনে জানালাম। ক্যামেরা নিয়ে খুব দ্রুত এবং খুব গোপনে ধৃত আসামীর ছবি নিয়ে একটি ক্যাসেট করে রাখবে। এরপর আর সুযোগ নাও পেতে পারো। প্রয়োজনে হলে আমার কথা বলে বলবে, তিনি পাঠিয়েছেন। সদর থানার কেউই জানেন না। সুতরাং কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ভিডিও রেকর্ড করে ফেলবে।
আবার সভা কক্ষে এসে যা শুনলাম, তাতে ভারত আর আওয়ামী লীগের দিকে ইঙ্গিত করে আলোচনার শেষ হচ্ছিল না। তখন আমি দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ কথা বলতেই আলতাফ হুসাইন বাঁধা দিয়ে বললেন, সাতক্ষীরা জেলার সব ঘটনাই যেন আনিসুর রহিমের সামনে ঘটে। তিনি যেন সব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী…।
এক পর্যায়ে দৃঢ়তার সাথে পুনরায় সভার সকলকে অবহিত করলাম এবং বললাম, প্রত্যক্ষদর্শীর বলা মতে, একজন আসামীকে সাতক্ষীরার পুলিশ ইতোমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে। আমার ধারণা যদি সঠিক হয় আরও দুই জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে আনতে সক্ষম হবে। সভার সকলে এক পর্যায়ে আমার কথা বিশ্বাস করেছিল। এটিএন বাংলায় ওই রাতেই প্রথম খবরটি প্রচারিত হয়। পরে অন্যান্য সকল মিডিয়ায় সাতক্ষীরার জেএমবির বোমা হামলার কথা প্রকাশ পেয়েছিল।
বাঁকাল ইসলামপুরের শেখ রওশন আলীকে তৎকালীন এসপি ও এএসপি সার্কেল দশ হাজার টাকা পুরস্কার দিয়েছিলেন। আমি আরও কিছু টাকা যোগাড় করে জাকির ইন্টারপ্রাইজ থেকে একটি স্যালে মেশিন হুজপাইপসহ কিনে দিয়ে রওশনকে পানি সেচের কাজে নিয়োগ করেছিলাম। এনএসআই’র ডিএডি সাহেব একটি রিকসা কিনে দিয়েছিলেন। শেখ রওশন আলীর পরিবার আত্মনির্ভর হয়েছিল। কিন্তু তাকে ডেকে নিয়ে জেএমবির লোকজন গলা কেটে ফেলে রেখে গিয়েছিল। রাতে সদর থানার পুলিশ প্রায় মৃত অবস্থায় সদর হাসপাতালে নিয়ে আসলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর জন্য চাপ দিলে তৎকালিন এসপি আব্দুল্লাহেল বাকিসহ আমরা সকলে যার কাছে যা টাকা ছিলো ওই রাতে খুলনায় পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলাম। অলৌকিকভাবে খুলনায় র‌্যাব ও পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মাঝে এবং পিডিবির প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের অর্থে শেখ রওশন আলী পুনর্জন্ম লাভ করে আজও বেঁচে আছে।
যারা বাংলাদেশকে জঙ্গিরাষ্ট্র বানাতে লিপ্ত আজও তাদের বিচার কাজ সম্পন্ন হয়নি। ‘বিলম্বিত বিচার না হওয়ার শামিল’। এভাবে দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। আসামীরা খুন জখম করে প্রকশ্যে ঘুরে বেড়াই আর ভিক্টিম ও তাদের পরিবারের স্বজনেরা চোখের পানিতে রাতে অন্ধকারে বালিশ ভিজিয়ে বিনিদ্র রজনী কাটায়।
আগস্ট মাস আসলেই আমাদের অনেক উপলব্ধি জাগরিত হয়। কিন্তু আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির জন্য যারা নিবেদিত প্রাণ হিসেবে নিরবিচ্ছন্নভাবে অবদান রেখেছেন, তারা নিরাপত্তাহীনতায় থেকে যায়। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, কুচক্রী মহলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকার জনগনকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুততার সাথে কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে অপরাধীরা বারবার দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকবে। শেখ রওশন আলীর মতো একজন দেশ প্রেমিক স্বাক্ষীর নিরাপত্তা বিধানও সমাজ রাষ্ট্র করতে ব্যর্থ হবে।