৫৭ ধারা আর চাপাতি’র হুমকির মুখে বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যম ও মুক্তচিন্তা


323 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
৫৭ ধারা আর চাপাতি’র হুমকির মুখে বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যম ও মুক্তচিন্তা
মে ৩, ২০১৬ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

সুমন কায়সার :

গণতন্ত্র অবরুদ্ধ হলে গণমাধ্যম তার স্বাধীনতা হারাবে এটি নতুন কিছু না। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র অবরুদ্ধ কি না তা বলতে না পারলেও গণমাধ্যম যে অনেকাংশে স্বাধীনতা হারিয়েছে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকতাকে আজ যে অন্ধ শেকলে আটকে ফেলা হয়েছে তা কঠিন লোহার শেকলের চেয়েও শক্তিশালী। গণমাধ্যমের সকল বিভাগকে সেই কঠিন শেকলে আটকে ফেলা হয়েছে। এমন কী ফেসবুক টুইটারের মতো সামাজিক গণমাধ্যমগুলোও আছে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে। ৫৭ ধারা দিয়ে রীতিমতো ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে বার্তা প্রবাহ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল তা আজ আইনী শেকলে আটকা পড়ে এক ধরনের গলার ফাঁস হিসেবে প্রতিয়মান হয়েছে। গাছেরটা খাবো আর তলারটা কুড়ানোর নীতিতে চলার কারণে কথিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এ নিয়ে কোন কথা বলেনি। বিএনপিও  প্রয়োজনীয় বিরোধীতার প্রকাশ ঘটাতে পারেনি তাদের আমলেই এ আইনের বীজ বোপিত হয়েছিল বলে। ইতিহাসের নিকটবর্তি শেকড়ে প্রবেশ করলে দেখা যায় বাংলাদেশে মূলত তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ২০০৬ সালে প্রথম তথ্যপ্রযুক্তি আইন তৈরি করা হয়। ওই আইনে নয়টি অধ্যায়ে মোট ৯০টি ধারা যুক্ত করা হয়। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ল্যাপটপ, স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যায়। এ আইনের অপব্যবহার ও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিষয়টি অনুধাবণ করে সরকার ২০১১ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সংশোধন আনার চিন্তা শুরু করে। এবং এ আইনের শাস্তি ও আইন প্রয়োগে পরিবর্তন আনার চিন্তা করে। অবশেষে ২০১৩ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে এ আইন প্রণয়ন করা হয়। একই বছরের ৮ অক্টোবর সংসদে আইনটি সংশোধিত আকারে পাস করা হয়। আর এই পাসকৃত আইন দিয়ে ডান্ডা মারা হচ্ছে যাকে তাকে। আজ নিয়তই ব্লগার থেকে শুরু করে শিক্ষকসহ মুক্ত চিন্তার মানুষদের মুক্ত চিন্তা প্রকাশের সাথে সাথেই রাষ্ট্রের চাইতে মুর্তিমান আতংক দানবরা সেসব মানুষদের হত্যা করছে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট সিপিজে ব্লগারসহ মুক্ত চিন্তার মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বললেও তা নিশ্চিত করেনি বাংলাদেশ। প্রতিনিয়তই ঘটছে বর্বোরচিত হত্যাকান্ড। আর রাষ্ট্র বলছে বেড টু বেড নিরাপত্তা দিতে পারবে না। এটি আসলে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার লজ্জাজনক প্রকাশ। এমনই এক প্রেক্ষাপটে বিশ্বে আবর্তিত হয়েছিল বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ইউনেস্কোর মূল দর্শনের প্রধান কেন্দ্র ছিল মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম- এ বিষয় দু’টি। ১৯৪৫ সালের নভেম্বরে গৃহীত ইউনেস্কোর গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে যে, ইউনেস্কোর সদস্যভুক্ত দেশসমূহ গণযোগাযোগের সুবিধাসমূহ কাজে লাগিয়ে নিজেদের পারস্পরিক জ্ঞান ও সকল জনগণের ধারণা বিনিময়ের কাজ এগিয়ে নেবে এবং কথা ও ছবির মাধ্যমে ধ্যান ধারণার মুক্ত প্রবাহ ত্বরান্বিত করবে। এছাড়া ইউনেস্কো মানবাধিকারের বিশ্ব ঘোষণার প্রতিও অঙ্গীকারাবদ্ধ যার ১৯ নং পরিচ্ছেদে ব্যক্ত হয়েছে:   “প্রতিটি মানুষের নিজস্ব মত পোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে; যেখানে মতে পোষণে কারো উপযাজকতা থাকবে না, যেখানে থাকবে যে কোন গণমাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য ও মুক্তবুদ্ধি চর্চা গ্রহণ ও বিনিময়ের অবাধ সুযোগ।”
ইউনেস্কোর ১৯৯১ সালের উইন্ডহোয়েক ঘোষণায় সংবাদ স্বাধীনতা বলতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বহুমুখীনতা ও বাধাহীনতাকে বোঝানো হয়েছে। নামিবিয়ার উইন্ডহোয়েক এ অনুষ্ঠিত সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ইউনেস্কো ও জাতিসংঘের জনসংযোগ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় “বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস”। সম্মেলনের ঘোষণাটি উইন্ডহোয়েক ঘোষণা নামেই পরিচিত, যেখানে নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা বলতে মুক্ত স্বাধীন সংবাদকে বৃহত্তম আঙ্গিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হিসেবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ১৯৯১ সালের জাতিসংঘের সাধরণ পরিষদের প্রস্তাব অনুসারে ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদের ২৬ তম সুপারিশের আলোকে দিবসটি পালিত হচ্ছে ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিবছর ৩ মে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপন করা হয়।
আজ বাংলাদেশে যে প্রেক্ষাপটে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপন করা হচ্ছে তখন দেশের সবচাইতে শক্তিশালী গণমাধ্যম ডেইলি স্টার থেকে শুরু করে সাধারণ ফেসবুকার সবাই আজ নিপীড়নের শিকার। রাষ্ট্র থেকে চাপাতি সবাই তাক করে বসে আছে। কেউই স্বাধীনভাবে আজ মতপ্রকাশ করতে পারছে না। সাথে আছে সাতান্ন ধারার খড়গ। ৫৭-এর ১ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।’
৫৭ ধারার ২ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১)-এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বছর এবং ন্যূনতম সাত বৎসর কারাদন্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবেন।’
তথ্যপ্রযুক্তি আইনটি সংশোধন করে ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর থেকে সমোলাচনা শুরু হয়। কেননা, এ আইনে পুলিশকে সরাসরি মামলা করার ও পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও সংবাদকর্মী ছাড়াও অনলাইন ব্যবহারকারীদের অনেকেই মনে করছেন, এ আইনের অপব্যবহার হতে পারে। তাদের শঙ্কার কথা অবশ্য এরই মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। সমস্বরে সকলেই বলছে ৫৭ ধারা আর মুক্ত গণমাধ্যমের চিন্তা দুটি আসলে যোজন যোজন দুরত্ববহ চিন্তা ভাবনা। এই ৫৭ ধারায় বারবার আটকানো হয়েছে বিরোধী মতকে। বিরোধী মত চিন্তা যারা আটকায় নিঃসন্দেহে তারা গণতন্ত্রের বৈপিরত্বে স্বৈরতন্ত্র চালিয়ে যাবারই নামান্তর কাজ করে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে গণমাধ্যম সরকারকে পরাজিত করতে চায় না। ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষতিকর ত্রুটি খুঁজতে সাহায্য করে। তাতে সুবিধাবাদি শ্রেণি পরিবেষ্টিত সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করে থাকে। যা বুঝতে অনেকেরই দেরি হয় বিধায় আজ আমাদের অনেক কিছু থেকেও চারিদিকে নেই নেই একটা আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে। আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বাধীন গণমাধ্যম উন্নয়নে যে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, বিশেষ করে আমাদের জাতীয় অর্জনের দিকে তাকালে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবেন। মুক্ত সাংবাদিকতার উৎকর্ষ সাধন করতে এমন পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে সকল প্রতিবন্ধকতা দূরে ফেলে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে নিরাপদে নিয়ে কাজ করবে। এমন পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হোক সকল দেশে ও সমাজে। নিশ্চিত হোক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুন্দর আগামী। আজকের চলমান ভীতিকর অবস্থায় মুক্ত মতপ্রকাশে ৫৭ ধারা ও চাপাতি যেভাবে তাক করে আছে তা দুর করতে হবেই। রাষ্ট্রকে নাগরিকের চিন্তার মতো করে না হয়ে যদি শুধুমাত্র সরকারের চিন্তায় বিকশিত হতে থাকে তাতে নাগরিকের কাছে আস্তে আস্তে অগ্রহণযোগ্যই শুধু না ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। # সুমন কায়সার: গণমাধ্যম কর্মী।