‌’মানুষের ভালবাসার ঋণ আমাকে আরো বেশি দায়িত্ববোধের বাঁধনে বেঁধেছে’


445 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
‌’মানুষের ভালবাসার ঋণ আমাকে আরো বেশি দায়িত্ববোধের বাঁধনে বেঁধেছে’
নভেম্বর ৩০, ২০১৮ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ লায়লা পারভীন সেঁজুতি ॥

রাজনীতির হাতেখড়িটা হয়েছিল মূলত বাবার বসার ঘরেই। প্রতিদিন সকাল হতেই বাবার প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী ও তালা-কলারোয়ার সাধারণ মানুষের পদচারণায় মুখরিত সেই ঘরের প্রিয় মানুষগুলো ছিল আমাদের প্রতিদিনের প্রাণের স্পন্দন। কঠিন বিধি-নিষেধ ছিলো নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তাঁর অতিথিদের বাড়ির গৃহকর্মী দ্বারা আপ্যায়িত করা। স্বাভাবিকভাবেই সেই কাজটি আমাদেরকেই করতে হতো।কেউবা মায়ের রান্নাঘরে, কেউবা ডাইনিং টেবিলে, কেউবা ড্রইং রুমের নাস্তার টেবিলে এভাবেই কাটতো সকালটা। সেই থেকেই শুরু হয়েছিল রাজনীতির আকর্ষণ। ছোট থাকলেও ভাবতাম নিশ্চয়ই আব্বার কাজটি খুবই মহৎ এবং মানবিক। সেই মহৎ এবং অকৃত্রিম মানবিক গুণাবলীর অধিকারী মানুষটি হঠাৎ বজ্রপাতের মত চরম অমানবিকতার শিকার হলেন ১৯৯৬ সালের ১৯ জুন। তাঁকে হত্যা করা হলো। আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা স. ম. আলাউদ্দিনকে হত্যার মধ্য দিয়ে রচিত হলো সাতক্ষীরার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। শুধু আমার পিতা হত্যা হলেন না, হত্যা হলো সাতক্ষীরার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চেতনা। হত্যা হলো সৃষ্টি। হত্যা হলো নবজাগরণের। হত্যা হলো সাতক্ষীরার আপামর জনসাধারণের আস্থা আর সম্ভাবনার দ্বার। আব্বার আকস্মিক চলে যাওয়া আমাদেরকে করেছিল দিশেহারা। জীবনের ছন্দপতন হলো। পায়ের তলার মাটিটা আলগা হয়ে গেলো। থেমে গেলো জীবনের স্বাভাবিক গতি প্রকৃতি। তখন বেঁচে থাকাটাই একটা চ্যালেঞ্জ হলো। সেদিনের সেই চ্যালেঞ্জই ছিল আমার ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু মাত্র। অভিভাবকহীন সংসারে সাধারণ মানুষের ভালোবাসার দ্বায়বোধ থেকেই আব্বার হাতেগড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিলাম। কিছুটা নির্বাক ভূমিকায় থেকে ভাবতাম কোনটা করবো? ভাই-বোনদের মানুষ করবো, মাকে সুস্থ রাখবো, স্কুলের দায়িত্ব পালন করবো, আব্বার ব্যবসা-বাণিজ্য, তাঁর হাতে গড়া প্রিয় পত্রিকা ‘দৈনিক পত্রদূত’ প্রকাশনা অব্যাহত রাখবো নাকি আব্বার মত রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে সাধারণ মানুষের সাথে থাকবো।সেই ভাবনার দ্বারে নতুন প্রশ্নের জন্ম হলো যার নিজেরই পায়ের তলার মাটিই আলগা সে সাধারণ মানুষের সাথে কীভাবে থাকবে। সাধারণ মানুষের সুখ দু:খের সাথী হতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন নিজের পায়ের তলার মাটি মজবুত করা। কত শতবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে যেয়ে পত্রদূতকে সন্ত্রাসী হামলার স্বীকার হতে হয়েছে। ২০১৩-’১৪ সালে জামাত বিএনপি’র সহিংসতায় বারবার পত্রদূতকেই জামাাত বিএনপি’র তোপের স্বীকার হতে হয়েছে। তবুও পত্রদূত থেমে থাকেনি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে। জীবন সংগ্রামে কখনো ভেঙে পড়েছি আবার কখনো উঠে দাঁড়িয়েছি বাবার নিরলস পরিশ্রমকে প্রেরণা হিসেবে সামনে দাঁড় করিয়ে আবারও পথ চলেছি। দৃঢ় মনোবল নিয়ে নিজেকে তৈরি করেছি, তৈরি করেছি গোটা পরিবারকে। দীর্ঘ জীবনযুদ্ধে আজ আমাদের পায়ের তলার মাটিটা শক্ত হয়েছে বলেই সাধারণ মানুষের সাথে থাকবার সেই সুপ্ত আকাক্সক্ষা আমাকে বারবার কুঠারাঘাত করেছে। আর সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে সহযোগিতা করে চলেছেন আমার অসংখ্য রাজনৈতিক, পারিবারিক অভিভাবক, বীর মুক্তিযোদ্ধা অভিভাবক, বাবার লক্ষ ভালবাসার মানুষেরা গোটা জেলার মুক্তিযোদ্ধা সন্তান ভাই-বোনেরা, তালা-কলারোয়ার সাধারণ জনতা, যেখানেই গিয়েছি আব্বার প্রতি তাদের সেই অকৃত্রিম ভালবাসা আমাকে কেউ মা হিসেবে, কেউ বড় বোন, কেউ ছোট বোন হিসেবে গ্রহণ করে এক অকৃত্রিম ভালবাসার বন্ধনে বেঁধেছে। তাঁদের সেই ভালবাসার ঋণ আমাকে আরো বেশি দায়িত্ববোধের বাঁধনে বেঁধেছে। বাবার প্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনটি আমারও প্রিয় সংগঠন, প্রিয় স্লোগান জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাবার মতই প্রিয় সংগঠনের একজন সাধারণ কর্মী হয়েই সবার সাথে মিলে মিশে কাজ করে যাবো। ইনশাআল্লাহ্।

লেখক :লায়লা পারভীন সেঁজুতি,দৈনিক পত্রদূত সম্পাদক।