সাতক্ষীরার উপকূীলয় অঞ্চলে গড়ে উঠছে চিংড়ি হ্যাচারি : বাড়ছে কর্মসংস্থান


1700 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার উপকূীলয় অঞ্চলে গড়ে উঠছে চিংড়ি হ্যাচারি : বাড়ছে কর্মসংস্থান
মে ১৭, ২০১৬ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

আহসানুর রহমান রাজীব:
সাতক্ষীরার সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় গড়ে উঠছে একাধিক চিংড়ি পোণা হ্যাচারি। এতে স্থানীয় পোণার চাহিদা পুরণের পাশাপাশি সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কমবে সুন্দরবনের নদী থেকে প্রাকৃতিক পোণা আহরণ। তবে এ পেশার সাথে সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন, এ অঞ্চলে মা মাছ (ডিম দেয় যে মাছ) সংরক্ষনের ব্যবস্থা না থাকার কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তারা। এ অঞ্চলে হ্যাচারি শিল্প ধরে রাখতে সরকারি উদ্যোগে মা মাছ সংরক্ষনের দাবি তাদের।

সরকারি হিসেবে সাতক্ষীরা জেলার ৬৭ হাজার হেক্টর জমিতে ৫৫ হাজার চিংড়ি ঘের (মাছের  খামার) রয়েছে। বেশিরভাগ ঘেরেই বাগদা চিংড়ির চাষ করা হয়। এসব ঘেরের চিংড়ির পোণা সংগ্রহ করা হয় সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও কক্সবাজারের বিভিন্ন হ্যাচারি থেকে। কক্সবাজার থেকে আসা পোণা পরিবহণে দীর্ঘ সময় লাগার কারনে পোণার গুনগত মান কমে যায়। চাহিদাও পুরণ হয় না।  তবে সম্প্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ, নওয়াবেকি এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি উন্নতমানের চিংড়ি পোণা হ্যাচারি। এসব হ্যাচারির পোণা ঘেরে চাষ করে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। কক্সবাজার থেকে মা মাছের নফলি এনে এখানে পোণা উৎপাদন করায় পোণার গুণগতমান অনেক ভাল।

কালিগঞ্জ উপজেলার শ্রীকলা গ্রামের চিংড়ি চাষি সাইদুজ্জামান জানান, দীর্ঘ  বিশ বছর বাগদা চাষ করছি। প্রথমে নদীর পোণা ঘেরে চাষ করতাম কিন্তু নদীতে এখন তেমন পোণা পাওয়া যায় না। এজন্য আমরা কক্সবাজারের পোণা ব্যবহার করি। তবে গত কয়েক বছর কক্সবাজার থেকে পোণা সময় মত না পাওয়ায় এখন স্থানীয় হ্যাচারির পোণা ব্যবহার করছি এতে মাছের উৎপাদন ভাল হচ্ছে। শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চিংড়ি চাষি মাসুম মোল্যা বলেন, ঘেরে নদীর পোণা ছাড়লে উৎপাদন অনেক ভাল হয়। তবে এখন নদীতে পোণা কম পাওয়া যায় দামও অনেক বেশি। এ কারনে হ্যাচারির পোণা চাষ করি। কক্সবাজার থেকে যে পোণা আসে তা মানের দিক থেকে অনেক ভাল। তবে ঐ খানে যে পোণা সকালে উৎপাদন হয় তা আমাদের কাছে পৌছায় সন্ধ্যার সময়। কোন কোন সময় এক দুই দিন পরেও পোণা আসে। দীর্ঘ সময় পরিবহণে থাকায় এসব পোণা  যে প্যাকেটে আসে তার অক্সিজেন ফেল হয়ে অনেক পোণা মারা যায়।  মাঝে মাঝে নওয়াবেকির হ্যাচারী থেকে মাছ এনে ঘেরে ছাড়ি এতে ফলন ভাল হচ্ছে। তবে এখান থেকে চাহিদা অনুযায়ী পোণা পাচ্ছি না। একই এলাকার ঘের ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ মোল্যা বলেন, বছরে  ৩থেকে ৪ মাস কক্সবাজার থেকে কোন পোণা আসে না, এসময় আমরা ভারতীয় পোণা ব্যবহার করতাম। তবে আমাদের শ্যামনগরে হ্যাচারি হওয়ায় সেখান থেকে পোণা নিয়ে ঘেরে ছাড়ি। এতে উৎপাদন ভাল হচ্ছে।

হ্যাচারির টেকনিশিয়ানরা জানান, স্থানীয় নদী ও ঘেরের পানির লবণক্ততার পিপিটি ও তাপমাত্রা অনুযায়ী আমাদের হ্যাচারি থেকে পোণা সরবারহ করা হয় বলে ঘের গুলোতে আগের চেয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের হ্যাচারির পোণার গুনগত মান ভাল হওয়ায় চাহিদা প্রচুর । কিছুদিন আগেও যারা সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল ছিল তারা কাজ করছেন এখানকার হ্যাচারি গুলোতে। এখান থেকে যা আয় হয় তাতে ভালভাবেই সংসার চলছে তাদের।
কালিগঞ্জের পোণা ব্যবসায়ি ইশারাত আলী বলেন, কক্সবাজার থেকে কালিগঞ্জ পরযন্ত পোণা আনতে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সে কারনে পোণা দুর্বল হয়ে যায়। স্থানিয় ভাবে পোণা উৎপাদন করা হলে পোণার মান ভাল হবে। কক্সবাজারের সৌদিয়া হ্যাচারির সাতক্ষীরা অফিসের ম্যানেজার মুজিবুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজার থেকে কার্গোবিমান জটিলতার কারনে ঘের গুলোতে সময় মত পোণা সরবারহ করতে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া সাতক্ষীরার ঘের গুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় নদীর পানি কম থাকায় পানির তাপমাত্রা একটু বেশি। এ কারনে কিছু মাছের সমস্যা হচ্ছে। এ অঞ্চলের হ্যাচারি গুলোতে যদি কক্সবাজার থেকে নফলি এনে ঘেরে পানির লবণাক্ততা ও তাপমাত্রা সহনশীল পোণা উৎপাদন করা হয় তাহলে এ সমস্যা থাকবে না।

জেলা চিংড়ি পোণা ব্যাবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, হ্যাচরি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারি ভাবে কোন ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায় না। এছাড়া সরকারকে মোটা অংকের রাজস্ব প্রদান করে গভীর সমুদ্র থেকে কার্গো জাহাজে করে লবণাক্ত পানি নিয়ে আসতে হয়। সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে কার্গো চলাচলে বনবিভাগের নিষেধাজ্ঞা থাকায় সব নদীতে চলাচল করা যায় না। এর ফলে পানি পরিবহণ ব্যায় বেড়ে যায়। পোণা উৎপাদনের জন্য যে মা মাছ (ডিম দেয় যে মাছ) প্রয়োজন তা আসে মূলত কক্সবাজার থেকে। এ অঞ্চলে যদি সরকারি ভাবে মা মাছ সংরক্ষনের ব্যাবস্থা করা হয় তাহলে হ্যাচারি গুলোতে উৎপাদন বাড়বে।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল অদুদ বলেন, এ অঞ্চলের হ্যাচারি গুলোতে সরকারি আইন মেনে পোণা উৎপাদন করা হচ্ছে। আরো কয়েকটি হ্যাচারী গড়ে উঠলে স্থানীয় চাহিদা পুরন করা সম্ভব হবে। ব্যাবসায়ীদের সমস্যার কথা উদ্ধতন কতৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করি সরকার সমস্যা সমাধানে দ্রুত উৎদ্যোগ নেবে।

সাতক্ষীরা জেলা চিংড়ি পোণা ব্যবসায়ি সমিতির হিসেবে জেলায় প্রতিদিন গড়ে দশ কোটি পিছ চিংড়ি পোণার চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় হ্যাচারি গুলোতে উৎপাদন হয় দুই কোটি পিছ। আর কক্সবাজার থেকে কার্গো বিমানে আসে প্রায় চার কোটি পোণা।  সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী থেকে সংগ্রহ করা হয় প্রায় চল্লিশ লাখ পোণা। প্রতিদিন ঘাটতি থেকে যায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি পোণার।