মানবিকতায় বদলে গেছে সাতক্ষীরার দৃশ্যপট —————————————-


600 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মানবিকতায় বদলে গেছে সাতক্ষীরার দৃশ্যপট —————————————-
জুলাই ১৬, ২০১৭ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

মানবিকতা, সহমর্মিতা আর ভালোবাসার ছোয়ায় বদলে গেছে সাতক্ষীরার দৃশ্যপট। পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের মনের, মানুসিকতার। শুধু সাংবাদিক সমাজ নয়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসনসহ সর্ব সাধারণ মানুষ সকলেই বিষয়টিকে খুব ভালো ভাবেই নিয়েছেন।

শুধু তারা নন, রাজনৈতিক নেতারা শুধু মুখের দম ফাটানো বুলি ছুড়লেও বাস্তবিক অর্থে কমই দেখা গেছে সর্বসাধারণের কাতারে। তবে দৃশ্যপট এখন পাল্টে গেছে। মানবিকতা সহমর্মিতার আর ভালোবাসার ছোয়া দিতে সকলের মাঝে যেন এক ধরণের অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলছে সাতক্ষীরার সর্বত্র।

বিষয়টি নি:সন্দেহে ভালো দিক। কেননা, এ প্রতিযোগিতার ফলে অসহায় মানুষরা উপকৃত হবে। নতুন ভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখবে।

মানবিকতা আর সহমর্মিতার কাজ করতে গিয়ে কিছু বাস্তব চিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। জানি না আপনারা বিষয়টিকে কিভাবে নিবেন বা দেখবেন। তবে আমার খুবই জানাতে ইচ্ছে করছে আপনাদের।

ছোটবেলা থেকেই দেখেছি আমার বাবা সব সময়ই অসহায় গরীব দু:খী মানুষের জন্য কাজ করেছেন। অনেক মানুষকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। যারা এখন স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করছেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার এমন কার্যক্রম দেখে আমারও সব সময় মনে হতো মানুষের জন্য কাজ করবো। বাবা সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন ফিরতেন রাতে।

কাছে পাওয়ার সৌভাগ্য খুব কমই হয়েছে। তার মানে এটা নয় যে, তিনি আমাদের কোন কিছু থেকে বঞ্চিত করেছেন। যখন যা প্রয়োজন তার থেকেও বেশী কিছু দিয়েছেন সব সময়। কোন চাওয়াই অপূর্ণ রাখেননি।

সৌভাগ্যক্রমে পরিচয় ঘটে জাগোনিউজের সহকারি বার্তা সম্পাদক মাহাবুর আলম সোহাগের সাথে। তিনি বিভিন্ন মানবিক ঘটনা নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। এটা দেখে উদ্বুদ্ধ হই আমিও। আমার ছোট বেলার সেই ইচ্ছা আর আগ্রহের প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ ঘটে তার মাধ্যমেই।

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জেয়ালা নলতা গ্রামের ইমরান নিকারী টাকার অভাবে খুলনা ভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারছিলেন না। এটা আমি জানার পরই শুরু হয় আমার মানবিক ঘটনা নিয়ে পথ চলার প্রথম ধাপ। অনেক ঘটনা শেষে অবশেষে ইমরান খুলনা ভার্সিটিতে ইংরেজী বিভাগে ভর্তি হয়ে যায়।

তার প্রয়োজন ছিলো ১৫ হাজার টাকার। জেনেছি সে ৪০ হাজারেও বেশী টাকা পেয়েছে। আমি নিজে হাতেই দিয়েছিলাম ১৮ হাজার। টাকাগুলো আমার নয়, হৃদয়বান মানুষদের পাঠানো টাকা।

এরপর হঠাতই সামনে আসে টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না সাতক্ষীরার কালিগজ্ঞের বালাকাটি গ্রামের রবিউল ইসলামের। ফেসবুক প্রচারনাসহ জেলা প্রশাসক ও জেলা সমাজসেবা কার্যালয়, জেলা পরিষদসহ বিভিন্নভাবে টাকা জোগাড় করে ঢাকা মেডিকেলের বার্ণ ইউনিট থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে ফিরিয়েছি তাকে।

ঘটনা চলছে মানবিকতার। সামনে পড়ে যায় সাতক্ষীরার তালা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা পারমাদরা গ্রামের দেবশ্রী রায়। মুখের ভিতর থেকে জিহ্বা অনেকটা ঝুলানো। ভারত থেকেও ডাক্তাররা ফিরিয়ে দিয়েছিলো তাকে।

সোহাগ ভাই আর আমার অনেক পরিশ্রম ত্যাগ এমনকি খেয়ে না খেয়ে ঢাকাতে কেঁটে যায় আমার ২২টি দিন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে দেবশ্রী। গোটা মিডিয়া পাড়ায় আলোচিত হয় এ দেবশ্রী নামটি। থেমে নেই মানবিকতা আর সহমর্মিতার এ গল্প।

নজরে আসে তালার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের লাউতাড়া গ্রামের অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা শিশু হাসান। মাথাটি অনেক বড়। মিডিয়া পাড়ায় সাড়া জাগানো হাসানকে ঢাকার আগারগাও নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষে বাড়িতে পৌছে দিয়ে আসি।

ঠিক যেমনিভাবে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানেও কেঁটে যায় প্রায় অর্ধ মাস। সোহাগ ভাই নিজের শরীরের রক্ত দেন হাসানের অপারেশনের জন্য। গল্পের শেষ হয়নি এখনো। সামনে আসে তালার জালালপুর ইউনিয়নের কানাইদিয়া গ্রামের লক্ষী রানী দাস। শিশু হাসান আর তার সমস্যাটা একই।

মাথাটা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটা বড়। তাকেও নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা আগারগাও নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালে কিন্তু সেখানকার ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে লক্ষী রানীকে চিকিৎসা করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। চোঁখে পানি নিয়ে ফিরে আসতে হয় ঢাকা থেকে।

তাদেরও বাড়ি থেকে যেমনি ভাবে নিয়ে গিয়েছিলাম ঠিক তেমনিভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম বাড়িতে। সেখানেও কেঁটেছিলা ৭টি দিন। চোঁখে পানি ছিলো সেদিন ভালোবাসার মঞ্চের সকল সদস্যের।

গল্পের অর্ধেকটা এসেছে কেবল। যখন শিশু হাসানের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ঠিক সে মুহূর্তে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে এক মা আমার হাত ধরে কেঁদে ফেলেন। টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না তার স্বামী আব্দুল মালেকের।

সেই মায়ের কথা রাখতে শিশু হাসানের প্রচারনার মধ্যেই শুরু করলাম আব্দুল মালেককে নিয়ে প্রচারনা। অবশেষে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করতে পেরেছিলাম কিন্তু বাঁচাতে পারিনি সেই সাতক্ষীরা সদরের শিবপুর গ্রামের আব্দুল মালেককে। তিনি মারা যান। অনেকটা নিরবে কেঁদেছি আমি।

আজো মনে পড়লেই চোঁখের পানি এসে যায়। বাবা তুমি আমার ছেলের মত, আমার বুকে খুব ব্যাথা করে আমাকে বাঁচাও কিছু একটা কর আমার জন্য। চোঁখের পানিটা আজ হয়ত অনেকটা শুকিয়ে গেছে।

এ গল্পের শেষ না হতেই সাতক্ষীরা ডক্টরস হাসপাতালে সাতক্ষীরা সদরের ঘোনা গ্রামের অবুঝ শিশু বাবু জন্মেই মৃত্যুর মুখে। অপারেশন প্রয়োজন। টাকা দরকার। আবারো ফেসবুক প্রচারনা। হয়ে গেলো একটা উপায়। ফেসবুক প্রচারনায় জেলা পরিষদ থেকেও সহায়তা নিয়ে রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে চিকিৎসা হয়। বর্তমানে সুস্থ রয়েছে শিশুটি।

গল্প শেষ নয় তালা সদরের মাঝিয়াড়া এলাকায় সমাজে পাগলী নামে পরিচিত জলি আক্তারকে ফেসবুক প্রচারনার মাধ্যমে ভালোবাসার মঞ্চ সমাজে তার স্টাটাস ফিরিয়ে দেয়। সকলেই এখন তাকে পাগলী না বলে জলি আক্তার নামেই ডাকে।

এবার আসা যাক সাতক্ষীরা শহরের অলিগলিতে ভিক্ষাবৃত্তি করে বেড়ানো মালেক বিশ^াস। তার স্বপ্ন ছিলো একটি প্রতিবন্ধি ভ্যানের। মূল্য দশ হাজার টাকা। টাকাটি কোনভাবেই তার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিলো না। ফেসবুক প্রচারনায় টাকা জোগাড় করেছিলাম। অবশেষে জেলা প্রশাসক স্যারের পরামর্শ মতে তাকে ভ্যান নয় একটি দোকান করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সম্প্রতি দেশের আলোচিত শিশু মুক্তা মনিকে নিয়েও আমার পদচানার কম হয়নি। জাগো নিউজের সংবাদে তোলপাড় শুরু হয় গোট দেশজুড়ে। তোলপাড় ঘটে বিদেশের মাটিতেও। অবশেষে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আব্দুস সামাদ জাগোনিউজের সংবাদের উপর সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জন মহোদয়কে লিখিত চিঠিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধক্রমে নির্দেশনা প্রদান করে।

এর আগেই স্বাস্থ্য সচিব মহোদয় চিকিৎসার দায়ভার নিয়েছেন বলে জাগো নিউজকে জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে চিকিৎসা সেবার দায়িত্বভার গ্রহন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যান্য মিডিয়াগুলো এই মুক্তা মনির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখেছে ও প্রচারনা চালিয়েছে।

উপরের যতগুলো গল্প আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। নিজের শ্রম কষ্ট আর চেষ্টার উদ্দেশ্যে ছিলো আমার এটাই সকলকে এক কাতারে এনে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সহমর্মিতা আর ভালোবাসা নিয়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। সাতক্ষীরার মাটিতে এখন শুধু একা আমি নই অনেকেই মানবিক যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন।

আমার বা আমাদের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ায় আমরা কেউই স্থায়ী নই। তবে কেন একে অপরের মারামারি হানাহানি দ্বন্দ¦-বিদ্বেষ।

একটা বাস্তব অভিজ্ঞতা এবার আপনাদের জানাতে চাই, কথাটি কি জানেন। যখন আমি একা দীর্ঘদিন ধরে এমন মানবিক কাজগুলো করে আসছি তখন অনেকেই অট্ট হাসি দিয়ে বলেছেন, আমি ব্যবসা করছি। টিটার, বাটপার, ধান্দাবাজ আরো কত্তকিছু। কিন্তু আমি তাদের কথায় কখনো থেমে যায়নি আমার রাস্তা থেকে। পিছু ফিরে আসেনি।

সেদিন যারা এসব বলতো আজ তারাই মানবতার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আমার জানতে মন চায় তাদের কাছে, আমি না হয় অনেক ব্যবসা করেছি। আপনি ত মুক্তামনির পেছনে ছুটলেন মানবতার জন্য। এখানে কত ব্যবসা হলো আপনার ? কিন্তু না। তারা বিষয়টিকে অনেক দেরীতে হলেও ভালোভাবে নিয়েছেন। আল্লাহ্ কাছে অশেষ শুক্রিয়া জানায়। তাদের জন্য দোয়া করি এভাবেই যেন অসহায়দের পাশে সব সময় দাঁড়াতে পারেন।

তবে হ্যা এর মধ্যে বেশ কিছু গল্প এখনো বাকি রয়েছে সেগুলো না হয় আরেকদিন শুনাবো আপনাদের। বর্তমানে সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানার দাদপুর গ্রামের পুতুল নামের একটি মেয়ে মৃত্যু পথযাত্রী। টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না তারও। বিধবা দিনমজুর মা মেয়ের চিকিৎসা করাতে ব্যার্থ।

বেশ কিছু ডাক্তার কবিরাজ দেখালেও কোন সুফল মেলেনি। তার চিকিৎসার জন্য চেষ্টা করছি। এখানেও আপনাদের সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। জানাবো আপনাদের। ইতোমধ্যে ঢাকায় একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে কথা হয়েছে। তিনি পুতুলকে ঢাকাতে নিতে বলেছেন। চেষ্টা করছি, বাকিটা আল্লাহ্ ভরসা।

আপনারা দোয়া করবেন পুতুলকেও যেন সুস্থ করে স্বাভাকি জীবনে ফিরিয়ে দিতে পারি আমরা সবাই মিলে। যেখানেই মানবিক বিপর্যয় সেখানেই থাকবো ইনশাল্লাহ্। আর হ্যা, এসব মনবিক কাজগুলো করার সৌভাগ্য ও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে প্রিয় প্রতিষ্ঠাণ জাগোনিউজ২৪.কম এর জন্য।

সকলেই এই এই প্রতিষ্ঠাণ ও জাগোনিউজ পরিবারের জন্য দোয়া করবেন। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মোঃ মহিউদ্দীন মহোদয় সব সময় আমার মানবিক বিষয়গুলোতে সহযোগিতা করেছেন। আপনারা তার জন্য দোয়া করবেন।

দোয়া করবেন সেসব হৃদয়বান মানুষদের জন্য যাদের পাঠানো টাকায় অনেক গুলো মানুষকে মৃত্যুকূপ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি তাদের জন্য।

…………

আকরামুল ইসলাম (সাংবাদিক)
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি, জাগোনিউজ২৪.কম, প্রতিদিনের সংবাদ, বিজয় টিভি, নিজস্ব প্রতিবেদক স্থানীয় দৈনিক সাতনদী।

##