বাড়ি যাচ্ছে তোফা ও তহুরা


174 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বাড়ি যাচ্ছে তোফা ও তহুরা
সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালে এসেছিল জোড়া লাগা শিশু তোফা-তহুরা। রোববার আলাদা অর্থাৎ তোফা ও তহুরা হয়ে গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ফিরল তারা।

মাঝখানে সময় কেটেছে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে চিকিৎসকরাও ছিলেন শঙ্কায়।

সবকিছু ছাপিয়ে সুস্থ হয়ে এখন বাড়ি ফিরল তোফা ও তহুরা। বিকেল তিনটার দিকে ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তত্ত্ববধানে অ্যাম্বুলেন্সে করে তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

এর আগে ঢামেক হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে সুস্থ, স্বাভাবিক তোফা ও তহুরাকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার মা-বাবার কাছে হস্তান্তর করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

রাজু মিয়া ও সাহিদা বেগম দম্পতির হাতে শিশু দুইটিকে তুলে দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ভালো থাকুক তোফা ও তহুরা। সুখী ও সমৃদ্ধশালী পরিবারের সন্তান হিসেবে তারা বেড়ে উঠুক। মা-বাবা মেয়েদের চিকিৎসক হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। প্রার্থনা করি তোফা ও তহুরা বড় হয়ে দেশের সেবায় যেন অবদান রাখতে পারে। তোফা ও তহুরার বাবা রাজু মিয়াকেও সরকারি চাকরির আশ্বাস দেন মন্ত্রী। একইসঙ্গে মন্ত্রী তাদের বাবার হাতে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলে দেন।

জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তোফা ও তহুরাকে নতুন জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য সংম্লিষ্ট চিকিৎসকের অভিনন্দন জানান মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেন, শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চিকিৎসকরা একটি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করায় তাদের অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই। চিকিৎসকরা প্রমান করেছেন, ঐকান্তিক ইচ্ছাশক্তি থাকলে সীমবদ্ধতা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনা। এর আগের মাগুরায় মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ শিশু সুরাইয়া, বৃক্ষমানব আবুল বাজনদার, বিরল রোগে আক্রান্ত মুক্তামনির চিকিৎসায় চিকিৎসকরা সাফল্য দেখিয়েছেন। এসব ঘটনায় চিকিৎসার জন্য মানুষের বিদেশগামীতা কমবে। দেশের মেধাবী ও দক্ষ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে মানুষ সেবা গ্রহনে আস্থা পাবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ব্যস্ততার মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময় শিশু দুইটির চিকিৎসায় সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রেখেছেন। তার উদার মানুষকিতার কারণে সব মানুষ বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বিষয়েও তিনি উদারতা দেখিয়েছেন। এ কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বিনা বাধায় বাংলাদেশে অস্থায়ীভাবে প্রবেশ করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে শিশু দুইটির চিকিৎসার তত্ত্বাবধানে থাকা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাহনূর ইসলাম বলেন, তোফা ও তহুরা ভালো আছে। তারাস্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারছেন। তোফা বসতে শুরু করেছে। তহুরা একটু শান্ত প্রকৃতির। দুই বোনই পরষ্পরের দিকে তাকাচ্ছে। হাতে খেলনা নিয়ে খেলছেন, হাসছেন। চিকিৎসক হিসেবে এমন দৃশ্য দেখতে পারা সত্যই আনন্দের, গর্বের।

আগামী ছয় মাস পর তাদের আবারও অস্ত্রোপচার করা হবে জানিয়ে অধ্যাপক ডা. সাহনূর ইসলাম বলেন, আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর তাদের বয়স ১ বছর পূর্ণ হবে। অস্ত্রোপনার করে আলাদা করার পাশাপাশি তাদের দু‘জনেরই মলত্যাগের জন্য অস্থায়ী মলদ্বার তৈরি করা হয়েছে। তাদের আরও ২ থেকে ৩টি অস্ত্রোপচার করতে হবে। ৬ মাস পর অস্ত্রোপচার করে মলদ্বারের রাস্তা বের করা হবে। ওই অস্ত্রোপচারে দুই মাস পর অস্থায়ীমলদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হবে। ধকল কাটিয়ে উঠতে সময় নিয়ে অস্ত্রোপচার করা হবে।

তোফা ও তহুরাকে পহৃনর্বাসনের আহ্বানের জানিয়ে ডা. সাহনূর ইসলাম বলেন, তাদের বাবা একজন দরিদ্র কৃষক। চিকিৎসা পরবর্তী তাদের পুনর্বাসন প্রয়োজন। এজন্য ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা সামর্থ অনুযায়ী তাদের সহায়তা করেছে। সবাই মিলে সহায়তার হাত বাড়ালে তোফা ও তহুরাকে উন্নতমানেরর জীবনে ফিরিয়ে আনা হবে। এজন্য ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখায় তোফা ও তহুরার নামে একটি যৌথ হিসাব খোলা হয়েছে। হিসাব নম্বর ১৩৯১৫১৭৩৭৪০। সামর্থবান আগ্রহী ব্যক্তিদের এই নম্বরে অর্থ দান করার আহ্বান জানান তিনি।

গত ১ আগস্ট ঢামেক হাসপাতালে জোড়া লাগা যমজ শিশু তোফা ও তহুরাকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করা হয়। অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়া কয়েকজন চিকিৎসক জানান, অপারেশন থিয়েটারে প্রথম দফায় অস্ত্রোপচার করে তাদের আলাদা করা হয়। এরপর দুইটি আলাদা অপারেশন থিয়েটারে রেখে চিকিৎসকরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে তাদের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।

জন্মের পর থেকে তোফা ও তহুরা জোড়া লাগা অবস্থায় ১০ মাস একসঙ্গে বড় হয়েছে। তাদের পিঠের কাছ থেকে কোমরের নিচ পর্যন্ত পরষ্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দূ’জনের পায়ুপথও ছিল অভিন্ন। তবে মাথা, হাত, পা পৃথক ছিল।

তোফা ও তহুরা যেভাবে জোড়া লাগানো ছিল, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে পাইগোপেগাস বলা হয়। চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশের ইতিহামে ‘পাইগোপেগা’ শিশু পৃথক করার ঘটনা এটি প্রথম। এর আগে অন্যান্য হাসপাতালে তিন জোড়া শিশুকে পৃথক করা হলেও তাদের ধরণ আলাদা ছিল। যমজ শিশু দুইটির বাবা রাজু মিয়া এবং মায়ের নাম শাহিদা বেগম গাইবান্ধার বাসিন্দা।