বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস আজ


44 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস আজ
নভেম্বর ১৪, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি স্বাস্থ্য
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
দেশে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শুধু বয়স্ক বা মধ্যবয়সী নয়, শিশুরাও এখন এই নীরব ঘাতকের শিকার হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম- সর্বত্র প্রায় সমান হারে ছড়িয়ে পড়ছে ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিস এখন প্রায় প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।

 

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানের কাছে এ বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে কত সংখ্যক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই। তবে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) বলছে, বাংলাদেশে ৭১ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বাডাস থেকে বিভিন্ন সময়ে দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে স্বল্প পরিসরে কয়েকটি জরিপ করে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে ১০ ও গ্রামাঞ্চলে ৮ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। কিন্তু বর্তমানে বাডাস ও এর অধিভুক্ত সমিতিতে নিবন্ধিত ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় ১৫ শতাংশ ডায়াবেটিস আক্রান্ত সমিতিতে নিবন্ধিত হচ্ছে। এ চিত্র বিশ্নেষণ করে বলা যায়, দেশের প্রতিটি পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের এক গবেষণায়ও শহরে ১০ ও গ্রামে ৮ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ডায়াবেটিস নিয়ে কাজ করে- এমন অন্তত ১০ জন চিকিৎসক জানান, সীমিত পরিসরে যে কয়েকটি জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে, তাতে দেশের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ওই জরিপ বিবেচনায় নিলে দেশে যে এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

 

এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘সকল গর্ভধারণ হোক পরিকল্পিত’। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘নারী ও ডায়াবেটিস :স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ আমাদের অধিকার’। এই প্রতিপাদ্য থেকে স্পষ্ট, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মধ্যেও

 

ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ছে। এসব নারীকে সেবা দিতে ডায়াবেটিক সমিতি ‘গর্ভধারণ-পূর্ব সেবা প্রকল্প’ নামে একটি নতুন প্রকল্প চালু করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর আজিমপুর, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও পার্শ্ববর্তী কেরানীগঞ্জে ২০১১-১২ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এক হাজার অন্তঃসত্ত্বা মায়ের ওপর দুটি পৃথক জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা মায়ের মধ্যে ১৯ শতাংশ এবং সব অন্তঃসত্ত্বা মায়ের মধ্যে ২২ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এসব মায়ের মধ্যে ১৫ শতাংশ এক বছরের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ৩২ শতাংশ প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় রয়েছেন।

 

ডায়াবেটিক সমিতির পরামর্শক ডা. বিশ্বজিৎ ভৌমিক এ প্রকল্পের সমন্বয়ক। তিনি জানান, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অর্ধেকের বেশি নারী পরে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। এমনকি অপরিকল্পিত গর্ভধারণের কারণে শিশু অপুষ্টির শিকার হলে এবং ওই শিশু পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর অতিরিক্ত ওজন হলে তার ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক গুণ বেশি থাকে।

 

দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী অপরিকল্পিত গর্ভধারণ করেন- এমন তথ্য জানিয়ে ডা. ভৌমিক আরও বলেন, গর্ভধারণের আট সপ্তাহের মধ্যে শিশুর গঠন-প্রকৃতি নির্ধারণ হয়। কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা মা ১২ সপ্তাহ বা তারও পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। ওই সময় সাধারণত কিছু করার থাকে না। গর্ভধারণের আগে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে মা ও শিশু উভয়েই সুরক্ষিত থাকবে। তবে এ পরিস্থিতিতেও বাডাসের বাইরে দেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসার খুব বেশি প্রসার ঘটেনি। এ ব্যাপারে সরকারেরও সঠিক মনোযোগ নেই।

 

ডায়াবেটিস মহামারী : দ্রুত নগরায়নের ফলে পরিবর্তিত জীবনযাপনের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। আইডিএফের ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪৩ কোটি। ১৯৮৫ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র তিন কোটি। গত আড়াই দশকে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৩ গুণ বেড়েছে। সংস্থাটি দুই বছর পরপর আক্রান্ত মানুষের তথ্য প্রকাশ করে। তাদের ধারণা, এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৪ কোটিতে উন্নীত হবে। এদিকে, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় বিশ্বের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান দশম স্থানে। বৃদ্ধির বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে পৌঁছাবে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডায়াবেটিসের কারণে প্রতিবছর পাঁচ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ডায়াবেটিসের কারণে অর্থনৈতিক চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডায়াবেটিসের ওষুধ, ইনসুলিন সবকিছুরই দাম দিন দিন বাড়ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, কেবল ডায়াবেটিসের হার কমাতে পারলে স্বাস্থ্য খাতেই ১১ শতাংশ ব্যয় কমানো সম্ভব।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৬ সালে প্রকাশিত হেলথ বুলেটিনে ডায়াবেটিসের ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়েছে, গত এক বছরে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কিংবা প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় রয়েছেন। ডায়াবেটিসজনিত কারণে মৃত্যুর হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ বলে ওই বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়।

 

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির আওতায় বারডেম, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক (এনএইচএন), হেলথকেয়ার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এইচসিডিপি) ও অধিভুক্ত সমিতিতে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ নিবন্ধিত ডায়াবেটিস রোগী রয়েছেন। এর মধ্যে ২০১১-১২ অর্থবছরে ২১ লাখ ১০ হাজার ১৪৬ জন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৩ লাখ ৫৫ হাজার ১১১, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৬ লাখ ১২ হাজার ১০২, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩০ লাখ ৬১ হাজার ৭১০ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৫ লাখ ১০ হাজার ৯০৬ জন ডায়াবেটিস চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। চলতি বছরের নিবন্ধনের সংখ্যা এখনও হিসাব করা হয়নি। তবে সমিতির সংশ্নিষ্টরা ধারণা করছেন, ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখে পৌঁছাবে।

 

বারডেমের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুন নাহার বলেন, প্রায় ৪০ লাখ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিকে আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি। তবে ধারণা করছি, আরও প্রায় সমপরিমাণ বা তার বেশি মানুষ এখনও সেবার আওতায় আসেনি। একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চল ও সচেতন নন- এমন অসংখ্য মানুষ জানেন না যে তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। চিকিৎসার বাইরে থাকা আক্রান্ত ব্যক্তির দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যদক্ষতা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। ডায়াবেটিসের কারণে হার্ট অ্যাটাক, কিডনি বিকল, অন্ধত্ববরণ ও পায়ে পচন ধরতে পারে। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও নিয়মিত হাঁটার মাধ্যমে প্রায় ৭০ শতাংশ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক এ স্বাস্থ্য সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ করতে ব্যাপকভিত্তিক জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

 

ডায়াবেটিস কী, কেন মানুষ আক্রান্ত হয় : বারডেমের এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ডায়াবেটোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ফারুক পাঠান বলেন, ডায়াবেটিস একটি বিপাকজনিত রোগ। মানবদেহে ইনসুলিন নামক হরমোনের ঘাটতি হলে কিংবা উৎপাদিত ইনসুলিন কার্যকরভাবে শরীরে ব্যবহূত না হলে অথবা শরীরের ইনসুলিন নিষ্ফ্ক্রিয় থাকলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এ গ্লুকোজ পরে প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। এ অবস্থার নামই ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিস দুই প্রকার। টাইপ-১ বা ইনসুলিননির্ভর ডায়াবেটিস এবং টাইপ-২ বা ইনসুলিন অনির্ভর ডায়াবেটিস। জন্মগত কিংবা পরিবেশগত কিছু কারণে টাইপ-১ ডায়াবেটিসের প্রকোপ দেখা দেয়। বছরে প্রায় ৩ শতাংশ হারে এ ডায়াবেটিস বাড়ছে এবং ৩০ বছরের কম বয়সীরা এতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ইনসুলিন নিয়েই এসব রোগীকে বেঁচে থাকতে হয়। অতিরিক্ত ওজন, মেদবাহুল্য, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, উচ্চ শর্করা ও কম আঁশযুক্ত খাদ্যাভ্যাস থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হতে পারে। এ ছাড়া পারিবারিক ইতিহাস, জন্মের সময় ওজন কম থাকা, প্রবীণদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিস দেখা যায়। ডায়াবেটিস রোগীরা হৃদযন্ত্র ও রক্তনালি, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র, অন্ধত্বসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে বলে জানান তিনি।

 

প্রতিরোধের উপায় : বিএসএমএমইউর এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ডায়াবেটিস সারাজীবনের রোগ। একবার হলে সারাজীবন বহন করতে হয়। ডায়াবেটিস কোনোভাবেই ওষুধ দিয়ে কমানো সম্ভব নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চললে এ রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।