“বদলে দেওয়া একজন মানুষের গল্প”


104 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
“বদলে দেওয়া একজন মানুষের গল্প”
ডিসেম্বর ৭, ২০১৭ তালা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

সোহাগ হোসেন::
“জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর” স্বামী বিবেকান্দের এই বাণী প্রতিফলিত হয়েছে একজন সাদা মনের মানুষের মাঝে। রাশেদ বিশ্বাস খুব সহজে বদলে দেওয়া একজন মানুষের নাম।সাতক্ষীরা জেলার তালা থানার আগড়ঝাড়া গ্রামের মধ্যবিত্ত এক পরিবারে জন্ম তার।

প্রকৃতি ও পাখিকে তো ভালোবাসে সবাই। কিন্তু পাখির প্রতি ভালোবাসার প্রকাশের ধরণটা এক এক জনের ক্ষেত্রে এক এক রকম। কেউ হয়তো বাসার খাঁচায় পাখি পুষতে ভালোবাসেন, আবার কেউ খাঁচার পাখিকে মুক্ত করে দিয়ে আনন্দ পান। অনেকে আবার ভালোবাসার মানুষটিকে আদর করে পাখি সম্বোধন করে।এমনও কিছু মানুষ আছে যারা নির্বিচারে পাখি মেরে ফেলে বা পাখির ছানা ধরে নিয়ে গিয়ে নষ্ট করে ফেলেন। রাশেদ তেমনি এক পাখি প্রেমী মানুষ। শুধু পাখি প্রেমী বললে ভুল হবে প্রকৃতি নিয়েই যার ভাবনা। যার মুখের কথায় ঝরে পড়ে প্রকৃতির জয়গান।

২০০৭ সাল, রাশেদ তখন খুলনা সরকারি বি এল কলেজে ইংরেজী বিভাগে পড়াশুনা করেন। পড়ার পাশাপাশি কিংবা ছুটির সময় সে পাখি ও জীববৈচিত্র নিয়ে কাজ করতে খুব উৎসুখ ছিল। এলাকায় যারা ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করতো,তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করে, কিংবা সচেতনতা বৃদ্ধি করে পাখি শিকারীদের সরিয়ে আনতো। এই দিয়েই যাত্রাশুরু তার।

এলাকার লোকজন রাশেদের এ কাজকে প্রথমে এ হেয়ালি করেন।মানুষের আশা মানুষের মতই সত্যি । খুব দৃঢ় আশা কখনোই বিফলে যায় না । কোন আশাই নিঃসঙ্গ নয় । কোথাও না কোথাও ভরসা আছে,থাকতেই হবে,খুঁজলে মিলবেই । আর আশা কেবল মানুষের জন্যই । খুব প্রতিকূল সময়ে রাশেদ এই কথাগুলোকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। কিভাবে স্রেফ আশার জোরেই স্বপ্ন সত্যি হয় সেটাই রাশেদের পাখি-প্রকৃতির গল্প । কিন্তু তার পাখি প্রকৃতি সংরক্ষণ সচেতনতা ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করে। কখনো বা নিজ এলাকায় আবার কখনো ভীন্ন জেলায় নিজের অর্থ খরচ করে যারা পাখি শিকার করে তাদেরকে সচেতন করে বেড়ান।কখন বা বিভিন্ন স্কুল কলেজে শিক্ষার্থীদের নিয়ে সচেতনতামুলক অনুষ্টান করেন।পাখি শিকারীদের সামনে পেলে যেন তারা বাঁধা দেয় সে শফত করান। পাখি শিকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস যোগান। শিকারীরা প্রকৃতির শত্রু। তার এ কাজকে অভিনন্দন জানিয়ে বাংলাদেশ পাখি ও বন্যপ্রাণী বিশ্লেষক শরিফ খান একটা সময় সাড়া দেন। তাকে উৎসাহ দেন।তাতে তার কাজে বেশ অগ্রগতি হয়েছে।

এলাকায় বন্যপ্রাণী যেমন বনবিড়াল, সারাল, শিয়াল,খেঁকশিয়াল এদের বাচ্চা অবিবেচক মানুষের শিকার হলে,রাশেদ খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান।এবং সে বাচ্চাগুলোকে রক্ষার জন্য কাজ করেন। পরিবেশ প্রকৃতি, জলবায়ুর ভারসাম্য ঠিক রাখতে হলে আমাদেরকে প্রকৃতির প্রাণ জীববৈচিত্র পাখি বন্যপ্রাণী এদের টিকিয়ে রাখতে হবে।কারন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এদের ভুমিকা অস্বীকার্য। প্রকৃতি বাঁচলে মানুষও বাঁচবে।

বন্যপ্রাণী রক্ষায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়,অবিবেচক মানুষদের সচেতনতা বৃদ্ধি করেন। পাখি শিকারী প্রতিরোধ করার জন্য বিভিন্ন মানুষের সাহায্য প্রার্থনা করে রাশেদ ব্যর্থ হয়। এজন্য অনেকের রোসানলে পড়তে হয় তাকে।

একটা সময় রাশেদের এ প্রকৃতি প্রেমের গল্প ফেসবুকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছায়।সেখানকার একজন প্রকৃতিপ্রেমী তার কাজে খুশি হয়ে তাকে একটি স্যামসাং S8 মোবাইল উপহার দেন। মোবাইলটি গতমাসের ১৫ তারিখে তার কাছে এসে পৌঁছেছে। বিদেশীদের কাছ থেকে উপহার পেয়ে তার কাজের উদ্দীপনা দ্বীগুন বেড়েছে। তার পরিকল্পনা সূদূরপ্রসারী।
রাশেদ বিশ্বাসের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এমন ব্যাতিক্রমী কাজে কেন উদ্বুদ্ধ হলেন।তিনি জানালেন ‘আমি পাখি-প্রকৃতি ভালবাসি। পাখি যখন আকাশে উড়েবেড়ায় আমার খুব ভাল লাগে। মানুষের মত সব প্রাণীর বাঁচার অধিকার আছে।তাই তাদের নিয়ে কাজ করি। আরও বলেন,সবার কাছে আমার আকুল অনুরোধ,পাখি ও বন্যাপ্রাণীর প্রতি সবাই সদায় হোন।বন্যপ্রাণী ও পাখি নিধোনকারীদের প্রতিরোধ করুন।প্রকৃতি বাঁচান নিজে বাঁচুন।

আমাদের দেশ থেকে অনেক জাতের পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে শুধু মাত্র নির্বিচারে গাছ কাটা ও পাখি হত্যার কারণে। পরিবেশকে বাঁচাতে ও পরিবেশের সৌন্দর্য রক্ষা করতে পাখির তুলনা নাই। তাই আমাদের দেশের পাখি বাঁচাতে আমাদেরকেই আরো সচেতন হতে হবে।
আলোর বাহিরে নিভৃতে প্রকৃতির সেবায় নিয়োজিত আছেন রাশেদের মত মানুষেরা। যাদের উপর নাই এই সমাজের লাইট, ক্যামেরার ফোকাস তবুও আপন মনে মানব সেবায় নিয়োজিত আছেন রাশেদরা।আমরা আশাকরি এমন রাশেদ বিশ্বাস গড়ে উঠবে বাংলাদেশের প্রতিটা অঞ্চলে এবং প্রতিটা ক্ষেত্রে। এইভাবে প্রকৃতি ও পাখিদের সেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা সবাই যদি এগিয়ে আসি তবে পৃথিবী গ্রহটা হয়ে উঠবে শান্তিময়।