সুন্দরবনে অবাধে কাঁকড়া শিকার


316 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবনে অবাধে কাঁকড়া শিকার
ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৮ ফটো গ্যালারি সুন্দরবন
Print Friendly, PDF & Email

॥ বিশেষ প্রতিনিধি ॥
————————

  • প্রজনন মৌসুমে বেশি লাভের আশায় চলছে কাঁকড়া শিকার।
  • কাঁকড়ার বংশবিস্তার কমে যাচ্ছে।
  • তদারকির দায়িত্বে থাকা লোকজনসহ অনেকেই এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।

জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি—বছরের এই দুই মাস কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম। রপ্তানিজাত সামুদ্রিক এই প্রাণিকুলের বংশবিস্তার স্বাভাবিক রাখতে বছরের এ সময়ে কাঁকড়া শিকার সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। তবে বন বিভাগের চোখ এড়িয়ে সুন্দরবনের নদীতে কাঁকড়া শিকার চলছে।

তদারকির দায়িত্বে থাকা লোকজন থেকে শুরু করে জেলে, স্থানীয় মোকামের ফড়িয়া, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের লোকজন এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। কাঁকড়ার চালান কোনোভাবে লোকালয়ে পৌঁছানোর পর তা নার্সিং পয়েন্টের (কাঁকড়া চাষ করা হয় এমন স্থান) কাঁকড়া প্রচার করে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে।

রপ্তানিজাত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এ প্রাণিজ সম্পদের বেশির ভাগ সংগৃহীত হয় সুন্দরবন ও আশপাশের নদ-নদী থেকে। ভরা এই প্রজনন মৌসুমে বেশি লাভের আশায় থেমে নেই কাঁকড়া শিকার। ফলে কাঁকড়ার বংশবিস্তার কমে যাচ্ছে। সুন্দরবন-সংলগ্ন বিভিন্ন বাজার ঘুরে ও সুন্দরবনে কর্মরত জেলেসহ স্থানীয় ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সুন্দরবন-সংলগ্ন দাতিনাখালী ও ৯ নম্বর সোরা গ্রামের দুই ব্যক্তি বলেন, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এই দুই মাস কাঁকড়া শিকার নিষিদ্ধ। তাই এ সময়টায় কাঁকড়া শিকারের পাস (অনুমতিপত্র) মেলেনি। অগত্যা তাঁরা মাছ ধরার পাস নিয়ে বনে প্রবেশ করেন। সপ্তাহজুড়ে সংগৃহীত ৬০ কেজি কাঁকড়া নিয়ে দুদিন আগে বাড়ি ফিরেছেন। বন বিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে লোকালয়ে ফিরে তাঁরা কলবাড়ী কাঁকড়ার আড়তে সব কাঁকড়া বিক্রি করেছেন।

বেশি লাভের আশায় কাঁকড়া শিকারের জন্য জেলেরা নিজ থেকে বনে যান না বলে দাবি করলেন জেলে আবুল কালাম ও জবেদ আলী। তাঁরা জানান, স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী দাদন দিয়ে জেলেদের বনে পাঠান। তাঁদের অভিযোগ, কালিঞ্চি, ভেটখালী, নৌয়াবেঁকী, কলবাড়ী ও মুন্সিগঞ্জের কিছু দাদন ব্যবসায়ী মোটা অঙ্কের টাকার লোভ দেখিয়ে ১৫-৪০টি নৌকায় জেলেদের বনে পাঠাচ্ছে। এ কাজ করতে চক্রটি বন বিভাগ থেকে শুরু করে সব পক্ষকে সামলানোর দায়িত্ব পালন করে।

একই ধরনের তথ্য দেন মীরগাং গ্রামের আমির আলী ও কালিঞ্চির হরশিদ মণ্ডল। তাঁরা বলেন, স্থানীয় কাঁকড়া ব্যবসায়ীরা দাদন দিয়ে নৌকা বনে পাঠান। তাঁদের নিরাপদে রেখে কাঁকড়া ধরার বিষয়টি সামলাচ্ছেন স্থানীয় দাদন ব্যবায়ীরা। রাতে সুন্দরবনের কাঁকড়া লোকালয়ে পৌঁছে নার্সিং পয়েন্টের কাঁকড়া হয়ে যাচ্ছে।

সুন্দরবন-সংলগ্ন হরিনগর, মুন্সিগঞ্জ, নওয়াবেঁকী, কলবাড়ী ও ভেটখালী বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকা থেকে প্রতিদিন কয়েক শ মণ কাঁকড়া রপ্তানির জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সব কাঁকড়া নার্সিং পয়েন্টের দাবি করলেও অধিকাংশ কাঁকড়া সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন নদ-নদীর বলে জেলেরা শিকার করেছেন।

ঢাকায় অবস্থিত রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আশফিয়া ট্রেডার্সের মালিক মো. ফারুক মোল্যা জানান, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের প্রায় ৫০ জন কাঁকড়া ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০-১২ টন কাঁকড়া আসছে।

পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শোয়াইব খান জানান, জানুয়ারি মাস থেকে কাঁকড়া ধরার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তারপরও চুরি করে জেলেরা ঢুকে কাঁকড়া শিকার করছেন, যাতে জেলেরা চুরি করে ঢুকতে না পারেন সে জন্য স্মার্ট টহল টিম পাহারায় নেমেছে। ইতিমধ্যে কাঁকড়া ধরার ছয়টি নৌকাসহ বিপুল পরিমাণ কাঁকড়া জব্দ করে নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাজারে তাঁদের তদারকি না থাকায় সুন্দরবনের কিছু কাঁকড়া জেলেরা ধরে ফড়িয়া কিংবা আড়তে বিক্রি করে থাকতে পারেন। এসবের সঙ্গে তাঁরা জড়িত নন বলে দাবি করেন তিনি।