কলারোয়ার অপরূপ পুরাকীর্তি শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দির অরক্ষিত


189 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
কলারোয়ার অপরূপ পুরাকীর্তি শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দির অরক্ষিত
এপ্রিল ১৬, ২০১৮ ইতিহাস ঐতিহ্য ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

কে এম আনিছুর রহমান,কলারোয়া :: ‌
প্রকৃতির সাথে পুরাকীর্তি যাদের সমানভাবে আকর্ষণ করে তাদের আসতে হবে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সীমান্ত জনপদ সোনাবাড়িয়ায়। মধ্যযুগীয় নানা পুরাকীর্তির নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে গোটা সোনাবাড়িয়া জুড়ে। এমনই এক পুরাকীর্তির নাম মঠবাড়ি মন্দির গুচ্ছ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারে অন্যতম পর্যটন ও তীর্থ কেন্দ্র। কলারোয়া উপজেলা সদর থেকে ৯.৬ কিলোমিটার দূরে সোনাবাড়িয়া গ্রামে এই প্রত‌ত্ন স্থলটির অবস্থান। প্রায় পৌণে ৪শ’ বছরের পুরানো ৬০ ফুট উঁচু টেরাকোটা ফলক খচিত পিরামিড আকৃতির এই মঠ-মন্দির প্রাচীন স্থাপত্যের অপরূপ নিদর্শন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। জরাজীর্ণ ও ভগ্নপ্রায় এই ঐতিহাসিক মঠ-মন্দিরটি এখনই সংরক্ষণ করা না গেলে একটি জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
গত বছরের ২৬ অক্টোবর এই মঠ-মন্দির সরেজমিনে পরিদর্শন করেন ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনার সন্দ্বীপ চক্রবর্তী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ। সেসময় উপস্থিত জনতা এটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের দাবি জানান অতিথিবৃন্দের প্রতি। প্রায় বছর পেরিয়ে যেতে থাকলেও স্থানীয়দের কোনো দাবি বাস্তবে রূপ নেয়নি। অবহেলিত মঠ-মন্দির অবহেলিতই থেকে গেছে।
প্র‌ত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক মোঃ মোশারফ হোসেনের লেখা “প্র‌ত্নতাত্ত্বিক জরিপ প্রতিবেদন বৃহত্তর খুলনা” বইয়ের ৯৪ পৃষ্ঠার দ্বিতীয় কলামে উল্লেখ করা হয়েছে এ মন্দির ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে জনৈক হরিরাম দাশ (মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাশ) নির্মাণ করেছিলেন। যেটি সতীশ চন্দ্র মিত্রের বইয়েও লেখা রয়েছে। এই পুরাকীর্তির সবচেয়ে বড় এর ত্রিতলবিশিষ্ট নবর‌ত্ন মন্দির। এটিই ‘শ্যামসুন্দর মন্দির’ নামে পরিচিত। এর সাথে লাগোয়া রয়েছে দুর্গামন্দির ও শিবমন্দির। এই মন্দিরগুচ্ছের দক্ষিণে একটি অসম বাহুবিশিষ্ট চৌকো দিঘি আছে।
শ্যামসুন্দর মঠের নিচের তলা ১০.৮২ মি./৩৫ফু.-৬ ই. বর্গাকার ভিত পরিকল্পনায় নির্মিত। এর দ্বিতলের মাপ ১০ মি./৩২ফু.-১০ই.ী ৯.৯৮ মি./৩২ ফু.-৯ ই. এবং ত্রিতল ৭.৪৬মি./২৪ ফু.-৬ ই.ী৭.১৬ মি./২৩ ফু.-৬ ই.। ফলে মন্দিরটি একটি পিরামিড আকৃতি ধারণ করেছে। দক্ষিণমুখি এই মন্দিরের নিচের তলার ভিতরের অংশে চারটি ভাগ রয়েছে। প্রথম ভাগের চারপাশে রয়েছে ঘূর্ণায়মান টানা অলিন্দ। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে ৬.১৪ মি./২০ ফু.-২ ই.পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা এবং ১.৩২ মি./৪ ফু.-৫ ই. চওড়া একটি মন্ডপ। তৃতীয় ভাগের পশ্চিম পাশের কোঠা এবং মাঝের কোঠাটির উত্তরে একটি করে প্রকোষ্ঠ রয়েছে। কিন্তু পূর্বাংশের কোঠাটির পিছনে রয়েছে একটি অলিন্দ, যেখানে দ্বিতল ভবনে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে।
ধারণা করা যায়, পূর্ব ও পিিশ্চম কোঠা দুটিতে সংরক্ষিত মূর্তির উদ্দেশ্যে মন্দিরটি নিবেদিত ছিল। দ্বিতলে রয়েছে একটি দক্ষিণমুখি কোঠা। এর পরিমাপ ২.২৮ মি./৭ফু.-৬ ই. ১.৯৮মি./৬ ফু,-৬ ই.। ত্রিতল ভবনটি তুলনামূলক ছোট। এর দক্ষিণ দিকের মধ্যের খিলানটির ওপর একটি পোড়ামাটির ফলক রয়েছে।


মোশারফ হোসেনের ওই জরিপ বইয়ে আরো বলা হয়েছে, শ্যামসুন্দর মঠের নিচে রয়েছে ৪৫.৭ সেমি./১ ফু.-৬ ই. উঁচু নিরেট মঞ্চ। এর প্রত্যেক তলার ছাদপ্রান্ত ধনুকের মত বাঁকা। কোণগুলো কৌণিক। এগুলোর ছাদের ওপর ক্রমাণ্বয়ে ধাপে ধাপে ঊর্ধমুখি গম্বুজ রয়েছে। আর মাঝখানে তুলনামূলক বড় একটি র‌ত্ন রয়েছে। এটি তাই ‘নবর‌ত্ন স্মৃতি মন্দির’।
নবর‌ত্ন বা শ্যামসুন্দর মঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আরও একটি দক্ষিণমুখি মন্দির আছে। এটি ‘দুর্গা মন্দির’ নামে পরিচিত। শ্যামসুন্দর মন্দিরের গা ঘেঁষে পূর্বমুখি মন্দিরটিতে ৯১.৪৩ সেমি./৩ ফুট উঁচু একটি কালো পাথরের শিবলিঙ্গ আছে। এর ওপর একটি ভাষ্য ফলক পাঠোদ্ধার অনুপযোগী অবস্থায় সংস্থাপিত আছে। এর ছাদ চৌচালা, কার্ণিশ ধনুকাকারে বাঁকা এবং কোণগুলো কৌণিক। এটি ‘অন্নপূর্ণা মন্দির’ নামে পরিচিত। মন্দিরগুচ্ছের সব কটি ইমারতে ২২.৮৫ সেমি. ২০.৩১ সেমি. ২.৫৩ সেমি.(৯ই. ৮ই. ১ই.) পরিমাপের ইট ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো গাঁথা হয়েছে চুন ও সুরকি মিশ্রিত মসলা দিয়ে। বর্তমানে এ মন্দিরগুচ্ছ পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এই মঠের পাশে আরও ৮ টি (মতান্তরে ১০টি) মন্দির ছিল।
অনেকের মতে, রামহংস পরমানন্দ এক সময় মন্দিরগুলো পরিদর্শনে এসেছিলেন। জানা যায়, মঠ মন্দিরগুচ্ছের অল্প দক্ষিণে ‘জমির বিশ্বাসের পুকুর’ নামে যে জলাশয়টি আছে তার পাকাঘাটে ব্যবহৃত ইটের সাথে ‘অন্নপূর্ণা মন্দির’ এর ইটের মিল পাওয়া যায়। তাতে ধারণা করা হয় পুকুরটি একই সময়কালের নিদর্শন। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক পুকুরটি বিষমবাহুর আকার ধারণ করেছে।এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবি, প্র‌ত্নতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরগুচ্ছের সংরক্ষণের দায়িত্ব নিক। এটি একটি একটি তীর্থ কেন্দ্রে রূপ নিক। তাদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে মঠটি সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারতো সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সকল মানুষের কাছে দর্শনীয় স্থান ও আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
##