নজরুল জয়ন্তী আজ


288 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
নজরুল জয়ন্তী আজ
মে ২৫, ২০১৮ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
বাংলা সাহিত্যাকাশে তার আবির্ভাবকে বলা যায় অগ্নিবীণা হাতে ধূমকেতুর মতো প্রকাশ। তিনি নিজেই নিজেকে বলেছেন, ‘বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির’। তাই তার উপাধি বিদ্রোহী কবি। আবার বলেছেন, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য।’ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছেন ঠিকই কিন্তু প্রেমময় নজরুলও হিমালয়সম শুভ্র। আজ সেই দ্রোহ ও প্রেমের কবি, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৯তম জন্মজয়ন্তী। কাজী নজরুল বাংলা সাহিত্যের গতিপথ পাল্টে বিদ্রোহ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ধারা তৈরি করেন। উন্নত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন সাম্য আর মানবতা। ধ্যান-জ্ঞান, নিঃশ্বাস-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনায় তিনি সম্প্রীতির কবি, অসাম্প্রদায়িক মেরুদণ্ড।

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ, ২৫ মে। ধূমকেতুর সঙ্গে তুলনীয় এই মহান কবির ১১৯তম জন্মজয়ন্তী। কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৮৯৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। ছোটবেলায় পিতৃহারা হন। এর পর বাধার দুর্লঙ্ঘ্য পর্বত পাড়ি দিতে হয় তাকে। তবে বাংলার সাহিত্যাকাশে দোর্দণ্ড প্রতাপে আত্মপ্রকাশ করেন কবি নজরুল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন- ‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু/ আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’

নজরুলের সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি ও বিদ্রোহ। ধর্মীয় ভেদাভেদের প্রাচীর ভাঙার ঘোষণা দেন তিনি। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। তবে বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন- ইসলামি সঙ্গীত তথা গজল। নজরুল প্রায় তিন হাজার গান রচনা ও সুর করেছেন, যা নজরুল সঙ্গীত হিসেবে পরিচিত। মধ্যবয়সে তিনি পিকস্‌ ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। এক সময় তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। ১৯৭৬ সালে কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় এবং তাকে ‘একুশে পদক’ দেওয়া হয়। ওই বছর ২৯ আগস্ট তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন।

কাজী নজরুলের রচিত ‘চল চল চল’ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত। তার কিছু গান জীবদ্দশায় গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে গানের মালা, গুলবাগিচা, গীতি শতদল, বুলবুল ইত্যাদি। পরে আরও গান গ্রন্থিত হয়েছে। তবে তিনি প্রায়ই তাৎক্ষণিক লিখতেন। এ কারণে অনুমান করা হয়, প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের অভাবে বহু গান হারিয়ে গেছে। এ ছাড়া কাজী নজরুল গান রচনাকালে ১৯টি রাগের সৃষ্টি করেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

নজরুল সময়ের প্রয়োজনে এখনও সমান প্রাসঙ্গিক। বৈষম্যের দেয়ালে বিভক্ত বিশ্ব সম্প্রদায়ের মুক্তির বার্তা রয়েছে তার সৃষ্টিকর্মে। এ ব্যাপারে নজরুল গবেষক ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, অনুবাদের মাধ্যমে নজরুলের সৃষ্টিসম্ভার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে নজরুল ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে স্প্যানিশ, ফরাসি ও জার্মান ভাষায় নজরুলের সাহিত্য ভাণ্ডার অনুবাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি বিভাগ থাকলেও এখন পর্যন্ত আরবি ভাষায় নজরুল সাহিত্যের কোনো অনুবাদ হয়নি। ঢাকায় আরব দেশের দূতাবাসগুলোও এ বিষয়ে নির্বিকার।

নজরুলের সৃষ্টির যথার্থতা রক্ষার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, অনেকেই নজরুলের গানে বিকৃত সুরারোপ করছে। নজরুলের জীবনী নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে কেউ কেউ। নজরুলকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে না পারলে কেউ যেন নজরুল চর্চা না করে।

এদিকে, নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ পৃথক বাণী দিয়েছেন। তাকে নিয়ে জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। সরকারি-বেসরকারি চ্যানেল ও রেডিও স্টেশনগুলো প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বড় বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ‘জাতীয় জাগরণে কবি নজরুল’ প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশে নজরুলের স্মৃতিধন্য ময়মনসিংহের ত্রিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে সরকারিভাবে অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ত্রিশালের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এ আয়োজনে ‘জাতীয় জাগরণে কবি নজরুল’ শিরোনামে স্মারক বক্তৃতা দেবেন বেগম আকতার কামাল।

শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে আজ সকাল ১১টায় থাকছে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া ভোর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদসংলগ্ন নজরুল সমাধিসৌধে সর্বস্তরের মানুষ জাতীয় কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে।