বন্ধু তুমি শত্রু তুমি


116 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বন্ধু তুমি শত্রু তুমি
জুলাই ১১, ২০১৮ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

নারায়ণগঞ্জে ব্যবসায়ী প্রবীর হত্যা

অনলাইন ডেস্ক ::
দু’বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন পিন্টু দেবনাথ। পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে ভারত থেকে চিকিৎসা করিয়ে এনেছিলেন তাকে প্রবীর ঘোষ। তাদের যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, ঘনিষ্ঠতম বন্ধন। নগরের কালীরবাজার স্বর্ণপট্টির স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সবাই এটা জানেন, দেখেছেনও। তারপর একদিন নিখোঁজ হলেন প্রবীর ঘোষ, ক’দিন আগে। তার সন্ধানে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সব মিছিল-সমাবেশে পিন্টুর গা গরম করা বক্তব্য। প্রবীরের সন্ধান দিতে না পারায় পুলিশের কড়া সমালোচনাও ছিল তার সেসব তীক্ষষ্ট বাক্যে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রবীরের ঘাতক হিসেবে আটক করা ওই পিন্টুকেই। তার স্বীকার করা তারই ভাড়াবাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে উদ্ধার করা হয় খণ্ডিত লাশ। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা ‘থ’ বনে যান, আর নিহত প্রবীরের পরিবারের সদস্যরা হয়ে পড়েন বাকরুদ্ধ। বন্ধু হয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে এভাবে খুন!

পিন্টু দেবনাথের সহযোগী হচ্ছেন বাপন ভৌমিক বাবু। দু’জন মিলেই খুন করেন প্রবীরকে, পিন্টুর ফ্ল্যাটে। তারপর ছয় টুকরো করেন, ফেলে দেন ওই বাড়িরই সেপটিক ট্যাঙ্কে। তার চার টুকরো সোমবার মধ্যরাতে উদ্ধার হলেও মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি দুটি পা। সন্ধ্যার আগে সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) আবদুর রাজ্জাক জানান, ওই বাড়ির পুরো সেপটিক ট্যাঙ্কের সব ময়লা পরিস্কার করেও আর কিছু পাওয়া যায়নি সেখান থেকে।

কোথায় ফেলা হয়েছে প্রবীরের পা দুটি?

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে। দুই ঘাতকের কাছে তাদের অনেক প্রশ্ন আছে, জানার আছে উত্তরও। ঘাতক পিন্টুর ওপেন হার্ট সার্জারি হওয়ায় একটু যত্ন নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হচ্ছে তাকে। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে একটু দেরি হচ্ছে এজন্য। তার সহযোগী বাপনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে আদালতে। তবে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফতাব উজ জামান। আর প্রবীর ঘোষ হত্যার বিচার চেয়ে নগরের স্বর্ণপট্টির ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ রেখেছেন এবং শোকে ভাসছেন কালো পতাকা উড়িয়ে।

ঘটনা সম্পর্কে মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মঈনুল হক প্রেস ব্রিফিং করেছেন তার কার্যালয়ে। তিনি বলেছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ হত্যার সঙ্গে জড়িত তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু অন্য স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দেবনাথ ও বাপন ভৌমিক নামে দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে গ্রেফতারকৃতরা কী কারণে, কীভাবে এবং কী দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি এখনও। এজন্য রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তাদের।

গ্রেফতারকৃত পিন্টু দেবনাথ কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার চন্দনপুরের মৃত সতীশ দেবনাথের ছেলে। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পিন্টু স্বর্ণ শিল্পালয়ের পাশেই। প্রয়াত রাশেদুল ইসলাম ঠাণ্ডুর চারতলা বাড়ির দোতলায় ভাড়া নিয়ে বাস করতেন তিনি। ব্যক্তি জীবনে অবিবাহিত হলেও পিন্টুর চরিত্রের নেতিবাচক বিষয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা অবগত। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না তার লেনদেন ভালো না হওয়ার কারণেও। আর বাপন ভৌমিক বাবু হলেন কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার ঠেটালিয়া গ্রামের কুমদ ভৌমিকের ছেলে। নগরের কালীরবাজার স্বর্ণপট্টি এলাকার কাজী ভবনের নিচতলায় মা স্বর্ণ শিল্পালয় নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরফুদ্দিন বলেন, প্রবীর ঘোষ নিখোঁজ হওয়ার পরপরই পুলিশ তাকে উদ্ধারে অভিযান শুরু করে। ১৮ জুন রাতে পিন্টুর বাড়ির সামনের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পিন্টুর পেছন পেছন হেঁটে যাচ্ছেন প্রবীর। ওই ফুটেজ দেখে পুলিশ একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পিন্টুকে। কিন্তু বাইপাসের রোগী হওয়ায় তাকে তেমন চাপও দিতে পারছিল না তারা। ফলে এর আগে তিনবার তাকে বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তার চতুরতায় তেমন কোনো তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। প্রতিবার জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ১৮ জুন রাতে তার কাছে এসে সাড়ে সাত হাজার টাকা চেয়েছে প্রবীর। পিন্টু তার কাছে দেড় হাজার টাকা আছে বলে জানালে টাকা না নিয়েই সে চলে যায়। তৃতীয়বার জিজ্ঞাসাবাদের তিনি জানিয়েছেন, ইসলাম হার্ট সেন্টার নামে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন পিন্টু। এ কারণে তার ওপর থেকে পুলিশও শেষ পর্যন্ত সন্দেহ সরিয়ে নেয়।

পুলিশ সুপার শরফুদ্দিন আরও বলেন, নিখোঁজ প্রবীরের মোবাইল ফোন নম্বরটি আমরা অব্যাহতভাবে ট্র্যাকিং করছিলাম। ১৮ জুন রাতে ফোনটি নগরের আলমখান লেনের সামনে থেকে বন্ধ হয়ে যায়। এর পর সেটি সচল হয় ২১ জুন। ওইদিন প্রবীরের মোবাইল ও সিম ব্যবহার করে একটি খুদেবার্তা পাঠানো হয় প্রবীরের ছোট ভাই বিপ্লবের মোবাইলে। তাতে উল্লেখ করা হয়- এ ঘটনার সঙ্গে কালীরবাজারের রাঘববোয়ালরা জড়িত। প্রবীরকে ছাড়াতে দেড় কোটি টাকা নিয়ে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের ওপর যেতে বলা হয়। বিপ্লব এই খুদেবার্তাটি দেখালে পুলিশ বিপ্লবের মোবাইল থেকে ফিরতি বার্তা পাঠায়- কবে, কখন, কার কাছে টাকা পৌঁছাতে হবে। কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে আর কোনো উত্তর না পাওয়ায় পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে জানতে পারে, প্রবীরের মোবাইল ফোনটি কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকায় সচল করা হয়েছিল। এরপর ওখানে প্রবীরের স্বজনদের নিয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ।

৭ জুলাই সন্ধ্যার পর হঠাৎ করেই প্রবীরের মোবাইল ফোনটি সচল হয়ে ওঠে আবার। ওটাতে অন্য সিম যুক্ত করে ব্যবহার করছে কেউ। পুলিশ আবারও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে জানতে পারে- এটি নগরের কালীরবাজার স্বর্ণপট্টি এলাকায় ব্যবহার হচ্ছে। ওই ফোনে যে সিমটি ব্যবহূত হচ্ছে সেই নম্বরে পিন্টু ৭৯ বার কথা বলেছে এ সময়ের মধ্যে।

৮ জুলাই সকালে পুলিশ বাপন ভৌমিক নামে এক যুবককে আটক করে, নিখোঁজ প্রবীরের মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ তার কাছ থেকে। মোবাইল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, সেটটি তাকে পিন্টু দিয়েছে। পরে তার তথ্যে পিন্টুকে ফের আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এক পর্যায়ে পিন্টু পুলিশকে জানান, প্রবীর মোবাইল ফোনটি তার কাছে রেখে আগরতলা চলে গেছেন। এ কথা কাউকে না জানাতে তাকে দিব্যি দিয়ে যাওয়ায় এতদিন মুখ খোলেননি তিনি। কিন্তু মোবাইল সেট তার কাছে দিয়ে গেলে প্রবীরের সিম কীভাবে কুমিল্লার সীমান্ত অঞ্চলে সচল হলো- এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি পিন্টু। এক পর্যায়ে পিন্টু ও বাপনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রবীরকে হত্যা করে লাশ পিন্টু তার ভাড়া বাসার সেপটিক ট্যাঙ্কে টুকরা করে ফেলে দিয়েছে বলে জানান। সোমবার মধ্যরাতে পুলিশ পিন্টুকে নিয়ে তার ভাড়া বাসার সেপটিক ট্যাঙ্কে তল্লাশি চালায়। তার উপস্থিতিতেই পুলিশ সেখান থেকে প্রবীর ঘোষের খণ্ডিত লাশের ৪টি টুকরা উদ্ধার করে।

ঘটনা ভিন্নদিকে প্রবাহিত করতে পিন্টুর যত চাতুরতা

১৮ জুন রাতেই পিন্টু তার ফ্ল্যাটে প্রবীরকে হত্যা করেছে বলে পুলিশের কাছে প্রাথমিকভাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তবে এ হত্যার সঙ্গে তারা দু’জনই জড়িত না আরও কেউ রয়েছে সে সম্পর্কে পুলিশকে কিছু বলেননি এখনও। প্রবীরকে হত্যা এবং লাশ সেপটিক ট্যাঙ্কে ফেলে দেওয়ার পরপরই পিন্টু তার সহযোগী বাপনকে প্রবীরের মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দিয়ে কুমিল্লা পাঠিয়ে দেন। বাপন পিন্টুর কথামতো কুমিল্লা সীমান্ত অঞ্চলে গিয়ে ২১ জুন সেটি সচল করে একটি খুদেবার্তা পাঠান প্রবীরের ছোট ভাই বিপ্লবের কাছে। এরপর মোবাইল ফোন আবারও বন্ধ করে দিয়ে, সিম ফেলে দিয়ে, সেটা নিয়ে ফিরে আসেন নারায়ণগঞ্জে। কিন্তু পিন্টুর নির্দেশ ছিল মোবাইল ফোনটি যেন ফেলে আসা হয় কুমিল্লায়, যাতে পুলিশ মোবাইল ট্র্যাকিং করলে জানতে পারে প্রবীর কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে গেছে। তাছাড়া ঘটনাটিকে অপহরণ হিসেবে সাজাতে কুমিল্লা থেকে প্রবীরের মোবাইল ব্যবহার করে মুক্তিপণ চেয়ে খুদেবার্তাটিও পাঠিয়েছিল। এসব কারণে পুলিশকে বেশ বেকায়দায় পড়তে হয় ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করতে। পুলিশও একটা সময় পর্যন্ত নিশ্চিত ছিল যে, হয়তো কোনো কারণে ভারতেই চলে গেছেন প্রবীর।

খুনের সম্ভাব্য কারণ

প্রবীর হত্যার কারণ সম্পর্কে পিন্টু মুখ না খুললেও পুলিশের ধারণা, ব্যবসায়িক কোনো দ্বন্দ্ব থেকে এ কাজ করেছেন পিন্টু। কারণ প্রবীর ও পিন্টু সুদের ব্যবসা করতেন একসঙ্গে। তারা স্বর্ণালঙ্কার রেখে সুদে টাকা ধার দিতেন। পুরো বিষয়টি দেখভাল করতেন পিন্টু। প্রবীবের ছোট ভাই ইতালি প্রবাসী সমীর ঘোষের মোটা অঙ্কের টাকাও ছিল প্রবীরের কাছে। প্রবীর তার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন টাকাগুলো। সম্প্রতি সমীর ইতালি থেকে ফোন করে প্রবীরকে টাকার হিসাব তৈরি রাখতে বলেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। এ কারণে প্রবীর হয়তো পিন্টুর কাছে টাকা ফেরত চেয়েছিলেন, ফলে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে পিন্টু। তবে এ সবকিছুই অনুমাননির্ভর। পিন্টু ও বাপনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে এসব বিষয়ের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে বলে তদন্তসংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পাশের ফ্ল্যাটের কেউই কিছু টের পাননি

হত্যার মতো এত বড় ঘটনা ঘটলেও পিন্টুর পাশের ফ্ল্যাটে থাকা ২ প্রতিবেশীর কেউ কিছুই টের পাননি। পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা অখিল মণ্ডল জানান, ১৮ জুন কোনো কিছু ঘটে থাকলে তারা কিছুই টের পাননি। পুলিশ ধারণা করছে, ১৮ জুন রাতে হত্যার পর লাশ টুকরা করে গভীর রাতে সেগুলো সেপটিক ট্যাঙ্কে ফেলা হয় সবার দৃষ্টি এড়াতে।

হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর বিচার দাবি করেছেন স্বর্ণশিল্পী সমিতির সভাপতি শঙ্কর ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক মুকুল মজুমদার। তবে ঘটনার পর থেকে নিহত প্রবীর ঘোষের পরিবারের সদস্যরা গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। মঙ্গলবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ পৌর শ্মশানে দাহ অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রবীরের।