ক্ষুধার্ত দূর্গাদের শেষ সম্বলটুকু ওরা কেড়ে নিতে চায়


140 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ক্ষুধার্ত দূর্গাদের শেষ সম্বলটুকু ওরা কেড়ে নিতে চায়
জুলাই ১৮, ২০১৮ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ জাহাঙ্গীর আলম কবীর ॥
‘আমাদের সংসার চলে না। যখন জোটে তখন খাই। সংসারে কাজ করার মতো কোন লোক নেই।’ বলছিলেন সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের নারী দূর্গা রাণী দাশ। তিনি তার সঠিক বয়স জানেন না। তবে যে ষাট পেরিয়ে গেছে- একথা নিশ্চিত। এখন মাজা সোজা করে চলাফেরা করতে পারেন না।
দূর্গা বলেন, তার স্বামী নিরাপদ দাশ অচল। বয়সের ভারে ন্যুজ্ব। তার শরীর দখল করেছে বার্ধক্যজনিত রোগ-ব্যাধি। তাই গ্রামের কেউ কাজে নেয় না, নিরাপদও করতে পারেন না। রোজগার করার মতো ছেলে দু’টো মানসিক প্রতিবন্ধী। পাড়া প্রতিবেশী, গ্রামবাসীরা বলে ‘পাগল’।
দূর্গা রাণী দাশের তিন ছেলে। বড় ছেলে অসীম দাশ তার স্ত্রী প্রতিমা দাশ ও বিয়ের যোগ্য তিন মেয়েকে নিয়ে থাকেন তাদের পুরনো ভিটেয়। অর্থের অভাবে মেয়েদের বিয়ে দিতে পারছেন না। মেঝে ছেলে অশোক দাশ (ছটিম) ও অসিত দাশ (গুলি) মানসিক প্রতিবন্ধী। একজনে বয়স ৪৫, অন্যজনের বয়স ৪০ বছর। দূর্গা রাণী বলেন,‘ওরা হাট-বাজার করতে বোঝে না। আবাদের হাট থেকে খালেক সরদারের ছেলে কেনাকাটা করে দিলে তাই বয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে।’ ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল গফ্ফার বলেন, ‘ওরা কোনটি ধান গাছ আর কোনটি ঘাস, তা তারা চেনে না। তাই কেউ তাদের জোন দিতে ডাকে না। ক্ষেতের বাদ দেয়া ঢেড়শ, বেগুন, বরবটি কাঁচা চিবিয়ে খায়।’ প্রতিবেশী জাহানারা বেগম বলেন, ‘এদের মতো অসহায় মানুষ ছয়ঘরিয়া গ্রামে আর নেই। ভিন্ন জাতির মানুষ হলেও আমাদের দেখতে হয়। যে যা দেয় তাই খেয়ে, না খেয়ে দিন কেটে যায়। মুসলমান হলে ভিক্ষে করতে বেরুতো। হিন্দু বলে তাও পারে না।’
জাহানারা বেগম আরও বলেন, ‘পলিথিনের একটা ঝুপড়িতে ওরা চারজন থাকে। রাতের বেলায় বৃষ্টি হলে পলিথিনের পেপার জড়িয়ে শুয়ে থাকে। এ কষ্টের যেন শেষ নেই।’ বৃদ্ধ নিরাপদ দাশ বলেন, ‘কারো কোন ক্ষমতা নেই তো কি করবো।’
ঘর নেই তাই আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে ছয়ঘরিয়া গ্রামের যুবকরা চাঁদা তুলে দোচালা একটা ঘর তুলে দিয়েছে। আরসিসি পিলার আর বাঁশের খুঁটি দিয়ে টালির ছাউনি। গ্রামের মানুষ ১০, ২০, ৫০, ১০০ টাকা, যার যা সামর্থ্য তাই দিয়ে সাহায্য করেছে। দোচালার ভেতরে রয়েছে দু’টো তক্তপোষ। এর একটি দিয়েছেন আব্দুল গফ্ফার। তিনি আরো দিয়েছেন বালিশ কাঁথা আর চাল রাখা ড্রাম। কিন্ত ঘরের বেড়া নেই। তাই শিয়াল-কুকুরের হাত থেকে নিস্তার নেই। নেই কোন নিরাপত্তা, আব্রু।


দিনের বেলায় ঝুপড়ির অদূরে নিরাপদ দাশ সারাক্ষণ শুয়ে থাকেন ‘গোস-কাটা’ ঘরে। এখানে আগে গরুর মাংস বিক্রি করা হতো। তার পরনে থাকে কম দামি গামছা কিংবা লুঙ্গি। একই অবস্থা ছটিম আর গুলির। দূর্গা দাশের পরনে ছেঁড়া শাড়ি থাকলেও গায় নেই ব্লাউজ। তার বড় ছেলে দিন-মজুর আর ছা’পোষা। কত আর দেখাশুনা করতে পারে।
মাথার ওপরে চাল ছিল না, চাল হয়েছে। মাথার রোদ-বৃষ্টি ঠেকালেও তাদের তিন বেলা খাবার মতো কোন ব্যবস্থা নেই। এতদিন কোন সরকারি সাহায্য পায়নি। রোজার ঈদের সময় ১০ কেজি চাল পেয়েছিলেন তারা। এবার নিরাপদ দাশের ভাগ্যে জুটেছে বয়স্ক ভাতার কার্ড। তাদের পুত্রবধূ প্রতিমা দাশ বলেন, ‘একবার মাত্র টাকা তুলতে পেরেছেন। প্রতিবন্ধী ছটিমের নাকি ভাতার ব্যবস্থা হয়েছে। তার কোন টাকা এখনও তারা পায়নি।’ কবে পাবেন তাও তারা জানেন না। তাদের দেয়া হয়নি ১০ টাকা কেজি’র চালের কার্ড। দূর্গা রাণী বলেন, ‘৪ কাঠা ৪ গোন্ডা জমিই আমাদের সম্বল।’
এই সম্বলের ওপর চোখ পড়েছে তার দেবর বিশ্বনাথ দাশের। প্রতিমা দাশ জানান, ভূয়া কাগজপত্র তৈরী করে ছয় বছর আগে বিশ্বনাথ এই জমিটুকু বিক্রি করেছে এক দালালের কাছে। নাম তার আব্দুল হাকিম মোল্যা। তার পিতার নাম ইমান আলী মোল্যা। বাড়ি সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুরে। জমি কেনাবেচা করেন। বিশ্বনাথ ও হাকিম, দু’জন মিলে বাইরের মোস্তান এনে দূর্গা রাণীদের উচ্ছেদ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গ্রামবাসীদের প্রতিরোধের মুখে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন। প্রতিমা দাশ জানতে পেরে ভূমি অফিসে অভিযোগ করেন। সেখানে বিশ্বনাথ ও হাকিম পরাজিত হয়। তারা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অফিসে আপিল করেও হেরে যান। প্রতিমা বলেন, ‘কিন্তু থেমে নেই বিশ্বনাথ ও হাকিম মোল্যা।’ তার দাবি তাদের বিচার করা হোক। দূর্গা রাণী জানেন না তাদের ভবিষ্যৎ কি। বলেন, ‘আমাদের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেবে ওরা। জানি না আমার পাগল ছেলে দু’টো আর স্বামীর কি হবে।’