পরচর্চার আরও চর্চা


139 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
পরচর্চার আরও চর্চা
আগস্ট ১৩, ২০১৮ ফটো গ্যালারি বিনোদন
Print Friendly, PDF & Email

 

॥ মো. রফিকুল ইসলাম ॥

পরনিন্দা-পরচর্চা হলো কারও সম্পর্কে অন্য কারও নিকট তার ভুল ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা। এ আলোচনায় তার খারাপ বা মন্দ দিক নিয়ে এক তরফা নিন্দাবাদ করা হয়। পরচর্চা-পরনিন্দা কারও অনুপস্থিতিতে করা হলে তাকে বলে গীবত আর নিন্দার সঙ্গে খানিকটা ভাল দিকের সামনাসামনি বা প্রকাশ্যে আলোচনা করা হলে তাকে বলে সমালোচনা। গীবত যেহেতু অনুপস্থিতিতে করা হয়, সেহেতু যাকে নিয়ে গীবত করা হয় তার অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় না। কিন্তু সমালোচনার ক্ষেত্রে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বা সংগঠনের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারে বিধায় তাদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেতে পারে। হোক সে সমালোচনা গঠনমূলক বা উদ্দেশ্যমূলক।

কখনও প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক বা কখনও বা ক্ষোভ পুষে রেখে পরবর্তীকালে প্রকাশ করা হয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কখনও রূপ নেয় কথা কাটাকাটি বা হাতাহাতি, চুলাচুলি বা মারামারি বা কখনও গোলাগুলিতে। হোক না সে সমালোচনা রাস্তায় বা পবিত্র কোন স্থানে। তাই তো আমরা সবচেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তিদেরও হাতাহাতি, ছোড়াছুড়ি মারামারি করতে দেখি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংসদে। মার্কিন কংগ্রেস থেকে জাপানে ডায়েট বা ভারতে লোকসভা কিংবা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কোথায় নেই মারামারি? আমরাতো পাকিস্তানি আমলে সংসদে মারামারি করতে গিয়ে চেয়ার ছুঁড়ে ডেপুটি স্পিকার শাহদ আলিকে মেরে ফেলে বোধ হয় রেকর্ডই করে ফেলেছি।

পরনিন্দা-পরচর্চা বা গীবত আমাদের এখন প্রিয় একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ গীবত বা পরচর্চা-পরনিন্দা করেনি এমন খুঁজে পাওয়া বোধ হয় যাবে না। তাই যাযাবরের দৃষ্টিপাতের বিখ্যাত মন্তব্য খানিকটা পরিবর্তন করে লেখা যায় দু’জন স্কটিশ একত্র হলে গড়ে তোলে ব্যাংক, দু’জন ব্রিটিশ একত্র হলে গড়ে তোলে ক্লাব আর আমরা দু’জন একত্র হলে করে কি পরচর্চা পরনিন্দা বা গীবত। গীবত করা খুবই গর্হিত একটি কাজ। আমাদের ধর্মে গীবতের বিষয়ে কঠোর নিষধাজ্ঞা আছে। তবুও দুঃখজনকভাবে এটা সকলের একটা প্রিয় বিষয়।

পরনিন্দা বা সমালোচনা প্রিয়জনকেও দূরে ঠেলে দেয়। সম্পর্কে ফাটল ধরিয়ে দেয় বা নিদেন পক্ষে মন তো খারাপ করে দেয়ই। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককেও ঝুঁকিতে ফেলে।

এখন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে সমালোচনার প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটা গল্প বলা যাক। স্বামী অফিসে যাবেন তাই স্ত্রী তার সকালের নাস্তা তৈরি করছেন। তিনি রান্নাঘরে ডিম ভাঁজছেন স্বামীর জন্য। হঠাৎ স্বামী রান্নাঘরে ঢুকে বলা শুরু করলেন, ‘সাবধান! সাবধান! আরও একটু তেল দাও। ও খোদা! তুমি একসাথে কতগুলো ডিম ভাঁজছো? উল্টাও, এখনি উল্টাও। আরও তেল দাও, তেল দাও। তেল কোথায়? লেগে যাচ্ছে। সাবধান! সাবধান! তুমি তো কখনই রান্নার সময় আমার কথা শুনো না। উল্টাও। তাড়াতাড়ি কর। তুমি কি পাগল হলে না কি। তোমার মন কই থাকে? লবণ দিতে ভুলো না। লবণ দাও। তোমার তো আবার লবণ দিতে মনে থাকে না। লবণ দাও। লবণ দাও।’

স্ত্রী অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে বললো, ‘তোমার আজ কি হল। তুমি কি মনে কর আমি ডিম ভাঁজতে জানি না না কি? আজ ডিম নতুন ভাজছি? তোমার কাছ থেকে ডিম ভাঁজা শিখতে হবে?’

স্বামী শান্ত, ধীরস্থিরভাবে জবাব দিল, ‘আমি তোমাকে দেখাতে চেয়েছিলাম আমি যখন গাড়ি চালাই তোমার এ রকম আচরণে তখন কেমন লাগে তার একটু হালকা অনুভূতি দিতে।’

স্টিভেন রাইট নামের এক ভদ্রলোক বলেছেন, প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত সমালোচনা আছে। একেবার যথার্থ বাণী। আপনি যা বলবেন বা করবেন তারই সমালোচনা অবধারিত। কোন মাফ নেই। যেমন ধরুন, এক লোক সস্ত্রীক একটা গাধা নিয়ে যাচ্ছে। যখন তারা দু’জন একসাথে গাধার উপর চড়ে বসলো তখন লোকজন দেখে বললো লোকটি কি নিষ্ঠুর দু’জন লোক গাধার উপর চড়ে বসেছে। আহা বেচারা গাধা। শুনে লোকটি যখন একা গাধার উপর চড়ে থাকলো ও স্ত্রী সাথে হেটে চললো তখন লোকজন বললো, লোকটা কেমন পাষাণ হৃদয়হীন। নিজে গাধায় চড়ে বৌকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবারে নিজে হেঁটে স্ত্রীকে গাধায় চড়িয়ে নিয়ে চললো। লোকজন এবারে সমালোচনা করলো, কি নির্বোধ স্ত্রৈণ লোকটি। স্ত্রীকে গাধায় চড়িয়ে নিজে হেঁটে যাচ্ছে। দু’জনেই হেঁটে চললে সমালোচনা হল, বোকার হদ্দ। কিভাবে গাধাকে কাজে লাগাতে হয় তাই জানে না। নিন্দা সমালোচনা ছাড়া যাবেন কই?

এরিস্টটল বলেছেন, সমালোচনা আমরা সহজেই পাশ কাটাতে পারি কোন কিছুই না বলে, না করে ও না হয়ে। এ কথাটারও কিন্তু সমালোচনা আছে। কারণ আপনি যাই করবেন তারই সমালোচনা হতে পারে। এমন কি কিছু না করলেও আপনার সমালোচনা হতে পারে। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে উদাহরণগুলো লক্ষ্য করুন। যেমন কেউ যদি চাকরির খোঁজে সারাদিন বাইরে বাইরে ঘোরাঘুরি করে তাহলে লোকে তার নাম দিবে বাউন্টুলে বা ভবঘুরে বা টো টো কোম্পানির ম্যানেজার। কিছুই না করলে নাম হবে ভাদাইম্যা বা অকর্মা। স্ত্রীকে চাকরি করতে দিলে বলবে বউয়ের কামাই খায়। চাকরি না করতে দিলে সন্দেহপ্রবণ। বউকে শাসন করলে অত্যাচারী, না করলে কাপুরুষ। এরকম অজস্র বিশেষণ। কি করবেন আপনি?

এতক্ষণতো শুধু পরচর্চা-পরনিন্দার নিন্দাই করলাম। এবার দেখা যাক এর কোন উপকারিতা আছে কি না? প্রশংসা করার মত কিছু আছে কি না। খুঁজে পেতে পাওয়া গেল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের বাণী। তিনি বলেছেন, সমালোচনা পছন্দ না হতে পারে তবে এর দরকার আছে। সমালোচনা মানুষের শরীরে ব্যথার মত। যার দরকার আছে কারণ ব্যথা শরীর অসুস্থ্ হলে জানান দেয়। তিনি অবশ্য আদর্শ একটা পরিস্থিতির কথা বলেছেন। অন্যদিকে প্রফেসর জ্যাক লেভিন নামের এক ভদ্রলোক বলেছেন, পরচর্চা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভাল হতে পারে।

পরনিন্দা-পরচর্চার যত নিন্দাবাদ বা সমালোচনা আমরা করি না কেন এর পক্ষে দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সনদ কিন্তু আমরা পেয়ে গেছি। অতঃএব আসুন মাভৈঃ মাভৈঃ বলে আমরা আমাদের প্রিয় বিষয় পরচর্চা-পরনিন্দায় অবতীর্ন হই; কারো মুণ্ডুপাত শুরু করি। তবে যেন সীমা অতিক্রম না করি। পরচর্চা-পরনিন্দার সীমা অতিক্রান্ত হলে কিন্তু মারামারি, হাতাহাতি, চুলাচুলি, গোলাগুলির সূচনা হতে পারে।

অতঃএব, সাধু সাবধান।