সাতক্ষীরায় পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে চাই মানসম্মত পাট বীজ


306 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে চাই মানসম্মত পাট বীজ
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮ কৃষি ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

মো. আব্দুর রহমান ::

সোনালী আঁশ খ্যাত পাট বাংলাদেশ ও ভারতের শত বছরের ঐতিহ্য। পাটের ইংরেজি নাম ঔঁঃব (জুট)। ২০১৭-১৮ বছরে বাংলাদেশের ৮ দশমিক ১৮২ হেক্টর জমিতে পাটের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৮৮ দশমিক ০৬০ লক্ষ বেল (এক বেলে প্রায় সাড়ে তিন মণ)। বাংলার সোনালী আঁশ পাট বন্যার কবলে পড়ে অনেক জেলায় পাটের আবাদ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বছরটিতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হয় না। তবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারলেও বছরটিতে আগের বছরের তুলনায় পাটের উৎপাদন খুব বেশি কমেনি। বন্যার মধ্যেও বছরটিতে ৭ দশমিক ৮৯৮ হেক্টর জমিতে ৮০ দশমিক ১১৮ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়। উৎপাদনের বর্ধিত হার ধরে রাখতে চলতি ২০১৮-১৯ ফসল কর্তন বছরে ৮ দশমিক ০৫ হেক্টর জমিতে ৮৮ দশমিক ৪০ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
চারকোল (এক্টিভেটেড কার্বন) পাটকাটি থেকে উৎপাদিত একটি পণ্য। কাঠের গুঁড়া, নারকেলের ছোবড়া ও বাঁশ থেকেও চারকোল উৎপাদন করা যায়। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ পাটকাটি থেকেই চারকোল উৎপাদন করে চীনে রপ্তানী চলমান রেখেছে। পাটকাঠিকে ছাই বানিয়ে তা রপ্তানির পথ দেখান ওয়াং ফেই নামের চীনের এক নাগরিক। পাটকাটির কার্বন চারকোল নামে পরিচিত। চারকোল বা কয়লা ছাড়াও পাটকাঠি থেকে অ্যাকটিভেটেড কার্বন উৎপাদন করা যায়।
পাট অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চারকোল উৎপাদনে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ১০ টাকার পাটকাটি দিয়ে ৮ ডলারের চারকোল উৎপাদন করা হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বে প্রতিবছর ৮ দশমিক ১ শতাংশ হারে চারকোলের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৮ সালে বিশ্বে চারকোলের চাহিদা হবে ২১ লাখ মেট্রিক টন। আর গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে চারকোলের বৈশ্বিক বাজার হবে ১০ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সুজলা-সুফলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশি^ম প্রান্তে সুন্দরবনের কোল ঘেষা জেলা সাতক্ষীরা। কৃষি আবাদের পাশাপাশি সুন্দরবন সংলগ্ন এ জেলার মানুষের প্রধান জীবিকা ছিলো বনজ সম্পদ আহরণ ও মৎস্য শিকার। জেলায় মোট ৩লক্ষ চুয়াত্তর হাজার ৯শ চুরাশি হেক্টর জমির মধ্যে ফসলি জমির পরিমাণ ২ লক্ষ ২৫ হাজার ৩শ বিরাশি হেক্টর জমি। বাংলদেশের ৪০ লক্ষ কৃষক ১২ লক্ষ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করে ১৫ লক্ষ ২৩ হাজার ৩শ পঁচিশ টন পাট উৎপাদন করে ২য় অবস্থানে রয়েছে। প্রথম স্থানে থাকা প্রতিবেশি দেশ ভারতে ১৯ লক্ষ ২৪ হাজার ৩শ ছাব্বিশ টন পাট উৎপাদন হয়। তবে কাঁচাপাট রপ্তানীতে বাংলাদেশ বিশে^র প্রথম অবস্থানে। আন্তজার্তিক বাজারে বর্তমানে পাট পণ্যের চাহিদা প্রায় ৭.৫০ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে ৪.৬০ লাখ মেট্রিক টন। ভারত রপ্তানি করে ২.৮৫ লাখ মেট্রিক টন। আন্তর্জাতিক পাট বাজারের মোট ৬২% বাংলাদেশ পূরণ করত। বাংলাদেশ ৫০-৬০ লাখ বেল কাঁচা পাট উৎপাদন করে। এর মধ্যে শিল্পে ব্যবহৃত হয় ৩২ লাখ বেল এবং রপ্তানি হয় ২৪ লাখ বেল। বর্তমানে বাংলাদেশ মোট সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপন্ন করে। যা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা থেকে দুই লাখ মেট্রিক টন কম। দেশে উৎপাদিত পাটজাত পণ্যের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার মাত্র ৮৩ হাজার ৫২৩ মেট্রিক টন। পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ ব্যবহার বা পটের তৈরি সামগ্রী ব্যবহারে আইন থাকলেও তা বাস্তবে দেখা মেলে না।
বাংলার কৃষকরা পচানো পাটকাটি থেকে গুচ্ছ বাধা কোশ্টা গুলো আলাদা করে ‘সোনালী ফসল’ ঘরে তোলে। ভিজে পাটকাটিগুলো শুকাতে রাস্তার পাশে তাড়া বেধে রাখা হয় এবং ধোবা কোশ্টাগুলো রোদ্র জাগায় বাঁশের আড়া তৈরি করে ছড়িয়ে শুকানো হয়। গতবছরের চেয়ে এবছর সোনালী আঁশ খ্যাত পাটের দামে লাভবান হবেন বলে মনে করছেন কৃষকরা। পাট চাষে লোকসান হলেও পাটকাঠি বিক্রি করে তা পুশিয়ে নিচ্ছে চাষিরা।
আবহাওয়ার কারণে এবছর পাটে পোঁকা কম দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট অধিপ্তরের সহকারী ‘কৃষি কর্মকর্তা’রা নিয়মিত মনিটরিং ও ফসলের সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, রাজবাড়ী, ফরিদপুরসহ ২৫-৩০টি কারখানায় অন্তত ৩ কোটি টন চারকোল উৎপাদন হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশই এসেছে প্রবীণবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে। আর বিগত অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৪৯৮ কোটি ১৬ লাখ ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রার যার পরিমাণ এক লাখ ২৩ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা।
সাতক্ষীরার সদর উপজেলায় ৪ হাজার ৮৫৫ হেক্টর জমিতে ৫৪ হাজার ৬৩৩ বেল, কলারোয়ায় ৪ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে ৪৫ হাজার ৬৮ বেল, তালায় ৩ তিন হাজার ১৫ হেক্টর জমিতে ৩৩ হাজার ৯২৮ বেল, দেবহাটায় ৯০ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ১৩ বেল, কালিগঞ্জে ১৭০ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৯১৩ বেল, আশাশুনিতে ৯০ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ১৩ বেল এবং দেশের সবচেয়ে বড় উপজেলা শ্যামনগরে মাত্র ৫ হেক্টর জমিতে ৫৬ বেলা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয় পাটচাষিরা জানান, ‘পাটের হারানো গৌরব-ঐতিহ্য ফিরে পেতে আমাদের সময় ও পরিমাণ মতো মানসম্মত পাট বীজ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। পাটচাষি ও মাঠকর্মীগণকে পাট উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, পাটের কাটা পরবর্তী ব্যবস্থাপনা পাট পচানো, শুকানো, গুদামজাতকরনের ব্যবস্থা গ্রহণ, বালাইনাশক সহজলভ্য ও সরবরাহ করা এবং বীজ সংরক্ষণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্দোগে গুদাম তৈরি করতে হবে।’
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘পাট উৎপাদনে এ জেলার মাটি অধিকতর কার্যকর। পাটের ইতিহাস এ দেশের শিকড়ের ইতিহাস। বর্তমান সরকারের কৃষি সেক্টরে বিশেষ নজর পড়ার কারণে সাফল্য ফিরে এসেছে। পাট চাষিদের জীবনমান উন্নয়নে নানা ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাট উৎপাদনে এবছর সাতক্ষীরা জেলার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে বলেন তিনি।’
সাতক্ষীরা ০২ আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মীর মোস্তাক আহমেদ রবি বলেন, ‘সরকার কৃষি বান্ধব হওয়ায় এ সেক্টরে আমাদের সাফল্য অনেক। কৃষকদের সার, বীজ, উৎপাদন খরচ এবং নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে ঐতিহ্যবাহী পাটের ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে বর্তমান সরকার পুরোপুরি প্রস্তুত। বাংলার সোনালি আঁশ অদূর অভিষ্যতে তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এ প্রত্যাশা।’
বাংলাদেশের সোনালি আঁশ অদূর অভিষ্যতে তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এ প্রত্যাশা কামনা এবং পাটের টোটাল উন্নয়নে পাট গবেষক ও বিজ্ঞানী, পাট সম্প্রসারণবিদ, পাটচাষী, পাট ব্যবসায়ী, পাট প্রক্রিয়াজাতকরণকারীসহ সব গর্বিত সহযোগীযোদ্ধা বন্ধুদের নিরন্তর শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা।
লেখক: মৎস্য চাষ ও কৃষি বিষয়ে ৬ মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত (২০১০), যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাগেরহাট।