সাতক্ষীরায় বাসক পাতার ব্যবসায় হাফিজুলের সাফল্য


368 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় বাসক পাতার ব্যবসায় হাফিজুলের সাফল্য
অক্টোবর ২১, ২০১৮ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ জাহাঙ্গীর আলম কবীর ॥

বাসক পাতা এখন আর ফেলে দেয়া জিনিস নয়। দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। বাসক পাতার ব্যবসা করে হাফিজুল ইসলামের কেটেছে বেকারত্বের অভিশাপ। তিনি বাসক পাতা কেনেন। আবার বিক্রি করেন ওষুধ কোম্পানীর কাছে। এলাকায় তিনি পরিচিত হয়েছেন হাফিজুল ইসলামের নয় ‘বাসক হাফিজুল’ নামে। বাসক পাতার ব্যবসা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ফিংড়ী ইউনিয়নে বাসক পাতা কেনা বেচার করার জন্য খুলেছে একটি বাসক পাতা বিক্রির সেন্টার।
হাফিজুল ইসলামের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ী ইউনিয়নের উত্তর ফিংড়ী গ্রামে। ফিংড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২ নম্বর পোল্ডার অভ্যন্তরের একটি গ্রাম। এখানেই খুবই কষ্টে জীবন যাপন করতেন। কাটতো তার বেকারত্ব জীবন। ২০১৭ সালের পানি উন্নয়ন বোর্ডেও ব্লুগোল্ড প্রোগ্রাম-এর সহযোগিতায় একমি কোম্পানীর জাতীয় পর্যায়ের সংগ্রাহক রফিক নামের এক বাসক পাতা ক্রেতার সাথে হাফিজুলের পরিচয় হয়। তিনি প্রথমে তার কাছে কিছু বাসক পাতা বিক্রি করেন। এতে তার কিছু অর্থ উপার্জন হয়। তার মধ্যে বেড়ে যায় উৎসাহ। ভাবতে থাকেন কিভাবে এটাকে ব্যবসা হিসাবে নেয়া যায়। ব্লু-গোল্ড প্রোগ্রামের সাথে যোগাযোগ করতে থাকেন। এক সময় তিনি এই প্রোগ্রামের মরিচ্চাপ পানি ব্যবস্থাপনা দলের সাধারণ সম্পাদক হন।
হাফিজুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব পাবার পর থেকে পানি ব্যবস্থাপনা দলের সদস্য গাভা গ্রামের বিউটি বেগম ও উত্তর ফিংড়ির খলিলকে নিয়ে তিনি বাসক পাতার ব্যবসা শুরু করেন। ব্লু-গোল্ড প্রোগ্রাম এর সহায়তায় এবছর স্কয়ার ওষুধ কোম্পানীর কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ হয়। তারপর থেকেই শুরু হয় হাফিজুলের জীবনের পরিবর্তন। এক সাথে ব্যবসা করার পর বিউটি বেগম ও খলিল এখন আলাদা ভাবে ব্যবসা করছেন।
হাফিজুল ইসলাম জানতে পারেন বাসক পাতার ওষুধি গুনাগুন সম্পর্কে। এই পাতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে কাশির সিরাপ। বাসক পাতার তৈরি ওষুধ বা সিরাপ শেষ্মা তরল করে নির্গমে সুবিধা করে বলে সর্দি, কাশি এবং শ্বাসনালীর প্রদাহ নিরাময়ে বেশ উপকারী। তাই ওষুধ কোম্পানীর সংগ্রাহকরা বাসক পাতা আগ্রহ সহকারে কেনেন। তিনিও পাতা সংগ্রহ করতে থাকেন।
ফিংড়ী হাফিজুলের ব্যবসা সেন্টারে পাতা বিক্রি করতে আসেন বিভিন্ন গ্রামের নারী পুরুষ। তাদের কাছ থেকে বাসক পাতা কেনেন। এক কেজি শুকনো পাতা কেনেন ৩৫ টাকায়। আধ শুকনো ৩০ টাকা। আর প্রতি কেজি কাঁচা পাতা কেনেন ৬ থেকে ৭ টাকা দরে। হাফিজুল বলেন, ৪ কেজি কাঁচা পাতা শুকালে এক কেজি পাতা হয়। শুকনো পাতা বিক্রি করেন ৪০ টাকা কেজি। এ পর্যন্ত তিনি শুকনা পাতা বিক্রি করেছেন ২শ’ কেজি। যার বাজার মূল্য ৪০ টাকা কেজি হিসেবে ৮০ হাজার টাকা। এই ব্যবসায় হাফিজুল খুবই আনন্দিত।
তার কাছে বাসক পাতা বিক্রি করতে আসেন ফিংড়ী গ্রামের শাকিল, আশিক, খালিদ, আবীর, ছাব্বির, রফিকুল, হালিমা, বিজয়, হাসানুর, রণি, শফিকুল, হাবিবুল্লাহ, সাকিবুর, ফায়জুল্লাহপুরের হজরত, মাজিদা, খোকা, বিজয় (২), পলাশ, মিন্টু, কুরমান, গাভার উজ্জ্বল, বিকাশ, বেনেখালীর তপন, কাদের, মোহাম্মাদ আলী, শফিকুল, বাবু, শফিকুল (২), আলমগীর, নিজমউদ্দিন, আইয়ুব আলী, মান্নান, ফারুখ, শিমুলবাড়িয়ার মোজাহারুল, শহিদুল, কুদ্দুস, আশরাফুল, ইবাদুল, নাটানার মশানচন্দ্র সরকার, দেবাশীষ, আরশাদ আলী, চিত্তরঞ্জন, নীলকান্ত, আছিয়া খাতুন, পূর্ণিমা, তরুণ, তুফান, জগদীশ ও লক্ষীরাণী সহ অসংখ্য নারী-পুরুষ। বিক্রি করতে আসে ব্যাংদাহ, গোবিন্দপুর, জোড়দিয়া ও গোবরদাঁড়ী গ্রামের মানুষরাও। তার মাধ্যমে এলাকার দরিদ্র নারীদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে। এ অঞ্চলে এরই মধ্যে বেশ সাড়া পড়ে গেছে বাসক পাতা নিয়ে। গ্রামবাসী নিজ নিজ বাড়ির চারপাশে বাসক গাছ লাগাচ্ছেন। গ্রামের দরিদ্র নারীরা প্রতিদিনই সংগ্রহ করছেন বাসক পাতা। পরিচ্ছন্নভাবে রোদে শুকিয়ে তা বিক্রি করছেন হাফিজুল ইসলাম, বিউটি বেগম ও খলিলের কাছে।
ফিংড়ী ইউনিয়ন এলাকাসহ আশেপাশের অঞ্চলে প্রচুর পরিমানে বাসক উদ্ভিদ জন্মায়। ঘেরা বেড়ায় ব্যবহার করা এই পাতা ছিড়লে গাছ মরে না। আবার নতুন পাতা গজায়। সারা বছর চলে নতুন পাতা গজানো। ডাল কেটে মাটিতে পুতে দিলেও নতুন গাছ ওঠে। আর্দ্র আবহাওয়ায় সমতল ভূমিতে এই উদ্ভিদ জন্মায়। বিকট গন্ধের কারণে এতে ছত্রাক জন্মায়না। এমনকি পোকা মাকড়ও ধরে না।
কামরুল ইসলাম, বাড়ি সাতক্ষীরার চাঁদপুর গ্রামে। তিনি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সংগ্রহকারী। তিনি জানান, তারা শুকনো বাসক পাতা কিনছেন। জার্মান প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতিতে বাসক পাতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে কাশির সিরাপ। এই পাতা দেশের ওষুধ শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
ব্লু-গোল্ড প্রোগ্রামের জোনাল কোঅর্ডিনেটর ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ জয়নাল আবেদীন বলেন, বাসক এর বৈজ্ঞানিক নাম আঢাটোডা বাসিকা (Adhatoda Vasica)। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের একটি উদ্ভিদ। ফিংড়ি ইউনিয়নের কাঁচাপাকা রাস্তার দুই ধারে ছয় কিলোমিটার এলাকা বরাবর রয়েছে বিপুল পরিমান বাসক উদ্ভিদ। এখানকার আনুমানিক দশ হাজার বাসক গাছ ব্যবহৃত হচ্ছে জমির চারধারে কিংবা বাড়ির ঘেরা বেড়ায়। এখান থেকে প্রতি বছর একশ’ টন সবুজ পাতা সংগ্রহ সম্ভব হবে। পাওয়া যাবে প্রায় ২৬ টন শুকনো পাতা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প ব্লু গোল্ডের আওতায় ২৮৫ জন নারী পুরুষ এখানে বাসক পাতা সংগ্রহ করছেন। এতে তারা অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করছেন। জয়নাল আবেদীন আরও বলেন, বাসক উদ্ভিদের জন্ম ও বৃদ্ধিতে ফিংড়ি অঞ্চলের মাটি অনুকূল। বেশি বেশি করে বাসক গাছ লাগালে এর পাতা দেশের ওষুধ শিল্পে অবদান রাখা ছাড়াও গ্রামীন অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে।

##