সুন্দরবনের দুবলার চরে ৩ দিন ব্যাপী রাস উৎসব শুরু


248 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবনের দুবলার চরে ৩ দিন ব্যাপী রাস উৎসব শুরু
নভেম্বর ২১, ২০১৮ ফটো গ্যালারি সুন্দরবন
Print Friendly, PDF & Email

এস,এম,আলাউদ্দিন সোহাগ ::

২১ নভেম্বর থেকে ২৩ নভেম্বর শুক্লপক্ষের চাঁদের আলোয় শোভিত নিরব সুন্দরবন চরাঞ্চল সরব হয়ে উঠবে পূণ্যার্থীদের পূজা ও আরাধনায়। দূর্গম সাগর-প্রকৃতির অভাবমায় সৌন্দর্যের মাঝে পূর্ণ্য অর্জন আর সঞ্চার যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। কার্তিক-অগ্রহায়ণে শুক্লপক্ষের ভরাপূর্ণিমা সাগর উছলে ওঠে। চাঁদের আলোয় সাগর-দুহিতা দুবলার চরে আলোর কোল মেতে ওঠে রাস উৎসবে।
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রাচীন সমুদ্র রাসমেলা সুন্দরবনের সাগরদুহিতা দুবলারচরে অনুষ্ঠিত হয়। রাসমেলা নিয়ে নানা মত রয়েছে। ধারণা করা হয় ১৯২৩ সালে ঠাকুর হরিচাঁদের অনুসরী হরি ভজন নামে এক হিন্দু সাধু এই মেলা শুরু করেছিল। এই সাধু ২৪ বছরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবনের গাছের ফল-মূল খেয়ে জবিন-যাপন করতেন। তিনি হরিচাঁদ ঠাকুরের স্বপ্নাদৃষ্টি হয়ে পূজা-পর্বনাদি ও অনুষ্ঠান শুরু করেন দুবলার চরে। তারপর থেকে মেলা বসেছে লোকালয়ে এই মেলা নীল কোমল মেলা নামে পরিচিত। অন্যমত হিন্দু ধর্মালম্বীদের অবতার শ্রীকৃষ্ণ কোন এক পূর্ণিমা তিথিতে পাপমোচন এবং পূর্ণলাভে গঙ্গাøানের স্বপ্নাদেশ পান। সেই থেকে শুরু হয় রাসমেলা। আবার কারও কারও মতে শারদীয় দুর্গোৎসবের পর পূর্ণিমা রাতে বৃন্দাবনবাসী গোপীদের সাথে রাসনৃত্যে মেতেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।
বঙ্গোপসাগরের মোহনায় সুন্দরবনের দুবলাচরে ও আলোর কোলে রাস পুর্ণিমায় রাধাকৃষ্ণের পুজা, পুর্ণ্যøান অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষ্যে রাসমেলায় পুর্ণিমা তিথিতে চরে নির্মিত মন্দিরে নামজ্ঞোগ্য, রাধাকৃষ্ণ, কমল কামিনি ও বনবিবির পূজা অনুষ্ঠিত হবে। পুর্ণিমার পুর্ণ তিথিতে সকালে সাগর ঢেউয়ে পুর্ণ্যøানের জন্য হাজার হাজার নারী পুুরুষ বিভিন্ন ধরনের প্রসাদ নিয়ে মানত ও মনোবাসনা পুর্ণের জন্য সাগর চরে সারীবদ্ধ হয়ে বসবে। সাগর ঢেউয়ে øান শেষে পুর্ণাথিরা বাড়ী ফেরা শুরু করে। অটুট বিশ্বাস আর পুর্ণ ভক্তিতে কমল কামিনীর দর্শন মেলে। পুণ্যার্থীরা কমল কামিনী দর্শনের আশায় নিলকোমলের সাগর মোহনায় সাগর ঢেউয়ে স্লান করে। রাস পুর্ণিমায় প্রথম আসা সমুদ্র ঢেউকে নিলকোমলের ঢেউ বলা হয়। এই প্রথম ঢেউয়ে পুর্ণাথিরা তাদের হাতে ধরে রাখা প্রসাদ ঢেউয়ে উৎসর্গ করে ¯œান সেরে শেষ করে। রাস পুর্ণিমা উপলক্ষ্যে ৩ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানে পুজা, সারারাম ব্যাপী নাম কীর্ত্তন, ছাড়াও আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর ১৩৫ তম রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানাগেছে, এবার মেলা বেশ জমজমাট ভাবে উদযাপনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
প্রকৃতির অকৃপণ হাতের সৃষ্টি লোনা জলের সাগরের এই রাসমেলায় দূর-র্দূরান্তে তীর্থযাত্রীদের ঢল নামে। ভয়ঙ্কর সুন্দর এই সুন্দরবন। যেখানে একদিকে অ্যাডভেঞ্চার, অন্যদিকে ভয় আর শিহরণ। জলে কুমির, আর ডাঙ্গায় বাঘ। বনের প্রতিটি মূহুর্ত যেন রহস্য আর রোমাঞ্চকের এই মেলায় দর্শনার্থীরা প্রাকৃতিক সৌন্দার্যের অভাবনীয় রূপ উপভোগ করে। প্রতিবছর উৎসবের দিনগুলোতে নিরব সুন্দরবন যেন লোকালয় হয়ে জেগে ওঠে।
পুণ্যস্ননে নিরাপদে যাতায়াতের জন্য দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীদের জন্য সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ আটটি পথ নির্ধারণ করেছে। এ সকল পথে বন বিভাগ, পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ড বাহিনীর টহল দল তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীদের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।
অনুমোদিত আটটি পথ হলো-বুড়িগোয়ালিনী, কোবাদক থেকে বাটুলানদী-বলনদী-পাটকোষ্টা হয়ে হংসরাজ নদী হয়ে দুবলারচর। কদমতলা হতে ইছামতি নদী, দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া-কাগাদোবেকী হয়ে দুবলার চর। কৈখালী স্টেশন হয়ে মাদার গাং, খোপড়াখালী ভাড়ানী, দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া-কাগাদোবেকী হয়ে দুবলার চর। কয়রা, কাশিয়াবাদ, খাসিটানা, বজবজা হয়ে আড়–য়া শিবসা-শিবসা নদী-মরজাত হয়ে দুবলার চর। নলিয়ান স্টেশন হয়ে শিবসা-মরজাত নদী হয়ে দুবলার চর। ঢাংমারী অথবা চাঁদপাই স্টেশন হয়ে পশুর নদী দিয়ে দুবলারচর। বগী-বলেশ্বর-সুপতি স্টেশন-কচিখালী-শেলার চর হয়ে দুবলার চর এবং শরণখোলা স্টেশন-সুপতি স্টেশন-কচিখালী-শেলার চর হয়ে দুবলার চর।
দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীরা ২১ হতে ২৩ নভেম্বর এ তিন দিনের জন্য অনুমতি প্রদান করা হবে এবং প্রবেশের সময় এন্ট্রি পথে নির্দিষ্ট ফি প্রদান করতে হবে। যাত্রীরা নির্ধারিত রুটের পছন্দমতো একটি মাত্র পথ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন এবং দিনের বেলায় চলাচল করতে পারবেন। বনবিভাগের চেকিং পয়েন্ট ছাড়া অন্য কোথাও নৌকা, লঞ্চ বা ট্রলার থামানো যাবে না। প্রতিটি ট্রলারের গায়ে রং দিয়ে বিএলসি অথবা সিরিয়াল নম্ব^র লিখতে হবে। রাস পূর্ণিমায় আগত পুণ্যার্থীদের সুন্দরবনে প্রবেশের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা ইউপি চেয়ারম্যানের নিকট হতে প্রাপ্ত সনদপত্র সাথে রাখতে হবে। পরিবেশ দূষণ করে এমন বস্তু, মাইক বাজানো, পটকা ও বাজি ফোটানো, বিস্ফোরক দ্রব্য, দেশীয় যে কোন অস্ত্র এবং আগ্নেয়াস্ত্র বহন থেকে যাত্রীদের বিরত থাকতে হবে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে অবস্থানকালীন সবসময় টোকেন ও টিকেট নিজের সঙ্গে রাখতে হবে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ সকল তথ্য জানিয়েছেন।
হিন্দুধর্মাবলম্বী লোকেরা পুর্ণিমার প্রথম প্রহরে সাগর জলে øান করে মনোবাসনা পুর্ণ ও পাপমোচন হবে এ বিশ্বাস নিয়ে রাসমেলায় যোগদিলেও সময়ের ব্যবধানে এ উৎসব নানা ধর্ম ও বর্ণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এ সময় অসংখ্যক বিদেশী পর্যটকদেরও আগমন ঘটে। আবাল বৃদ্ধ বনিতা, নির্বিশেষে সাগর চর এলাকায় উপস্থিতিতে কোলাহল, পদচালণায় মুখরিত হয়ে উঠবে। প্রতি বছর রাস উৎসব মানুষের মিলন মেলায় রুপ নেয়। সাগরপাড়ে দুবলা ও আলোরকোল চর সমুহে অনুষ্ঠিত রাস উৎসব সুন্দরবনের ঐতিহ্যকে আরো সমৃদ্ধ করেছে।