ডেস্ক রিপোর্ট ::
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে জোট-মহাজোট-আওয়ামী লীগের মধ্যে যে তাপ উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছিল ধীরে ধীরে তা থিতিয়ে যেয়েও ফের নতুন উত্তাপ পড়তে শুরু করেছে ভোটের মাঠে। আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীর অনুকূলে ক্ষোভ বিক্ষোভ দ্বন্দ্ব ভূলে দলীয় নেতা কর্মীদের বড় অংশ ফিরে এসেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের নীরব ভোটের প্রত্যাশার মাঠে যুক্ত হয়েছে কমপক্ষে দুই প্রার্থীর সরব উপস্থিতি। ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে এসে ভোট দিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌছে দিতে পারেন এমনটা ভাবছেন অনেকেই।
পরষ্পরের প্রতি চরম অসহিষ্ণ সাতক্ষীরা-১ আসনে আওয়ামী লীগসহ জোট-মহাজোটের নেতারা। এমনকি দলের মধ্যেও একে অপরের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ অবস্থান। কেউ যায় না কারো চেয়ে কম। এমনই পরিস্থিতির মধ্যে জোট-মহাজোটের আসন সমঝোতার সব সম্ভাবনা শেষ করে আসনটি আবার ফিরে এসেছে আওয়ামী লীগের ঘরে। নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন কলারোয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলারোয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ স্বপন। যারা এতদিন স্বপনের চরম বিরোধীতা করে এসেছেন তাদের অনেকেই তার পক্ষে ফিরে আসতে শুরু করেছেন। আবার মাঠ দাপাতে শুরু করেছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী সরদার মুজিব। আওয়ামী লীগের আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ নুরুল ইসলামও প্রচার প্রচারণায় মাঠে রয়েছেন। তিনি গণসংযোগ করছেন বিভিন্ন এলাকায়। এরই মধ্যে দীর্ঘ নিরবতা ভেঙে মাঠে নেমেছেন জাতীয় পাটির প্রার্থী সৈয়দ দিদার বখত।
বিএনপি-জামায়াত জোটের বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছেন ৪জন স্বতন্ত্রসহ ১০জন। এরমধ্যে নৌকার মনোনয়ন চুড়ান্ত হওয়ার পরপরই দুইজন প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এরমধ্যে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্য, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান, মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন সাতক্ষীরা মহাকুমা মুজিব বাহিনীর প্রধান ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান নিজ স্বাক্ষরিত প্রেসবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচন থেকে সরে দাড়ানোর ঘোষণা দেন। অপর প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য ওয়ার্কার্স পাটির পলিট ব্যুরোর সদস্য এড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহর পক্ষে তার দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক এড. ফাহিমুল হক কিসলু স্বাক্ষরিত প্রেসবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচন থেকে সরে দাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে দাখিলকৃত মনোনয়নপত্র নির্ধারিত সময়ে তারা প্রত্যাহার না করায় ৭জানুয়ারির নির্বাচনের ব্যালট পেপারে তাদের দু’জনেরই প্রতীক থেকে যাচ্ছে।
তালা-কলারোয়া উপজেলার তিনটি থানার ২৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-১ আসনে এবার মোট ভোটার ৪ লাখ ৭২ হাজার ৪৩জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৭জন এবং মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৫৪জন। এছাড়া ২জন হিজড়া ভোটার রয়েছে।
আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী ফিরোজ আহমেদ স্বপন ছাড়াও আসনটিতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন জাতীয় পাটির প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী এবং এই আসন থেকে ১৯৮৮ সালে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাংবাদিক ও রাজনীতিবীদ সৈয়দ দিদার বখত, জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ও বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এসএম মুজিবুর রহমান ওরফে সরদার মুজিব (স্বতন্ত্র), তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ নুরুল ইসলাম (স্বতন্ত্র), বাংলাদেশ কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব এড. ইয়ারুল ইসলাম, তৃণমূল বিএনপির সুমি ইসলাম, মুক্তিজোটের শেখ মো. আলমগীর এবং স্বতন্ত্র মো. নুরুল ইসলাম।
ভৌগলিকভাবে নির্বাচনী এলাকার দুটি উপজেলা দুই মেরুতে অবস্থিত। জেলায় সবচেয়ে বেশি ভোটার আসনটিতে। একপাশে ভারত সীমান্ত লাগোয়া কলারোয়া উপজেলার মোট ভোটার ২ লাখ ৬২ হাজার ৭৩৭জন। দশ প্রার্থীর মধ্যে কলারোয়ায় রয়েছেন ৩জন প্রার্থী। তিনজনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। এরমধ্যে একজন প্রার্থীর মাঠে কোন তৎপরতা দেখা না গেলেও অপর দুইজন সক্রিয়। নৌকার প্রার্থী ফিরোজ আহমেদ স্বপন এই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তবে, তিনি গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আমিনুল ইসলাম লাল্টুর কাছে পরাজিত হন। দু’জনার মধ্যে তীব্র বিরোধ থাকলেও সম্প্রতি তারা এক হয়ে নৌকার পক্ষে মাঠে নেমেছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা সরদার মুজিবের নির্বাচনী বক্তব্য নৌকার প্রার্থী ফিরোজ আহমেদ স্বপনকে ঘিরে। স্বপনের তীব্র সমালোচনা করে তার প্রতিপক্ষের ভোট পক্ষে আনার কৌশল নিয়ে তিনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এ উপজেলায় দশ প্রার্থীর অন্য কারো তেমন কোন তৎপরতা দেখা না গেলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থী সৈয়দ দিদার বখতকে সবাই এক নামে চেনেন। মন্ত্রী থাকাকালে কলারোয়া কলেজ সরকারিকরণসহ এলাকার উন্নয়নে তার ভূমিকা এখনো প্রবীনরা স্মরণ করেন। ফলে তার প্রতীকেও ভোট পড়ার সম্ভাবনার কথা বলেন অনেকে। তবে, দৃশ্যত কলারোয়ায় এখনো জাতীয় পাটির প্রার্থীর উল্লেখযোগ্য কোন তৎপরতা দেখা যায়নি।
কলারোয়ার তুলনায় তালা উপজেলায় ভোট কম হলেও এখানে আওয়ামী লীগ বেশ শক্তিশালী। মোট ভোটার ২ লাখ ৯ হাজার ৩০৬জন। এ ভোটাররা আবার বিভক্ত হয়েছেন দুটি থানায়। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ৫টি নিয়ে গঠিত পাটকেলঘাটা থানায় প্রার্থী দুই জন হলেও ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাড়িয়েছেন। ফলে এখন প্রার্থী রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ নুরুল ইসলাম। ২০১৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান। কিন্তু পরবর্তীতে ১৪ দলীয় জোটের সাথে সমঝোতায় আসনটি হারাতে হয় তাকে। তিনি দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, রয়েছেন মাঠে।
তালা থানার ৭টি ইউনিয়ন। এই এলাকা থেকে প্রার্থী রয়েছেন জাতীয় পাটির মনোনীত সৈয়দ দিদার বখত এবং মুক্তিজোটের শেখ মো. আলমগীর। মুক্তিজোট প্রার্থীর এখনো মাঠে দৃশ্যমান তেমন কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। তবে সৈয়দ দিদার বখত তালার ঐতিহ্যবাহি হাসেমী পরিবারের সন্তান। প্রবীন এই রাজনীতিবীদ তালা-কলারোয়া নির্বাচনী এলাকা থেকে ১৯৮৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এসময় তালা কলেজ সরকারীকরণসহ এলাকার উন্নয়নে তার ভূমিকা অনেকেই স্মরণ করেন। তবে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর থেকে মাঠে তার তেমন কোন তৎপরতা দেখা না গেলেও গত কয়েকদিন তিনি জোরে শোরে মাঠে নেমেছেন। তালা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তার নিরব ভোট রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
উক্ত ৭জন প্রার্থী ছাড়া আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য এড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ ওয়ার্কার্স পাটির দলীয় প্রতীক হাতুড়ি নেওয়ার পর তার দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। তিনি তালা-কলারোয়া নির্বাচনী এলাকার বাইরে সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। এছাড়া বাংলাদেশ কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব এড. ইয়ারুল ইসলামের জন্মস্থান কলারোয়া হলেও তিনি বর্তমানে ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা। তার প্রতীক ডাব। অপর প্রার্থী তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী “সুমি” ঢাকার মুগদাপাড়া এলাকার বাসিন্দা বলে তার হলফনামায় দেওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে।
জেলার সর্ববৃহৎ এই নির্বাচনী এলাকায় বর্তমানে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীর পক্ষে গণজোয়ার লক্ষ্য করা গেছে। অপরদিকে মাঠে সক্রিয় আওয়ামী লীগের অপর দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর আক্রমনের লক্ষ্যবস্তুতে তিনি পরিণত হয়েছেন। অপরদিকে মাঠে তুলনামূলক তৎপরতা কম থাকলেও জাতীয় পাটি মনোনীত লাঙ্গলের প্রার্থী প্রায় সাড়ে তিন দশক পূর্বে মন্ত্রী থাকার সময়ের সেই ভাবমূর্তি বর্তমান প্রজন্মের তরুণ ভোটারদের সামনে তুলে ধরে তাদের ভোট কতটুকু পক্ষে আনতে পারবেন এবং আঞ্চলিকতার ভোট ও ভোটার উপস্থিতি নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।