953 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
জুলাই ২৫, ২০১৫ প্রবাস ভাবনা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

জীবিত থেকেও যাঁরা মরে ভূত

ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড়ে সরকারি খাতায় মৃত রামজনম মৌরিয়া। জীবিত রয়েছেন এটা প্রমাণ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাঁদে পড়া এসব মানুষদের সহায়তা করছে মৃতক সিং নামে একটি সংগঠন। তাদের কাছে নিজের দুঃখের কথা বলছেন রামজনম। ছবি: এএফপিরবি ঠাকুরের ছোটগল্প ‘জীবিত ও মৃত’-এর কাদম্বিনীকে মরে প্রমাণ করতে হয়েছিল তিনি ভূত হয়ে যাননি। রবিঠাকুরের ভাষায়, ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই’। গল্পের কাদম্বিনী আর বাস্তবের রামজনম মৌরিয়ার গল্পটা প্রায় একই।

মরে তিনি ভূত হয়ে যাননি বটে, তবে এর সত্যতা প্রমাণে রামজনমের ইহজনম শেষ। গত দুই বছরে তাঁকে বহুবার ভারতের উত্তরাঞ্চলের আজমগড় হাকিমের কার্যালয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু সরকারি কর্তাব্যক্তিরা নাছোড়। তাঁদের খাতায় রামজনম মৃত।

হাকিমের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা রক্তমাংসের রামজনমকে জীবিত হিসেবে মেনে নিতে চান না। তাঁদের আচরণে রামজনমের হতাশা বেড়েছে। ৬৫ বছর বয়স তাঁর। আর কয়দিনই বা বাঁচবেন? এর আগেই এমন দুর্দিন দেখতে হলো তাঁকে। পারলে সবাই তাঁকে ভূত হিসেবে চিহ্নিত করে।

রামজনম ভারতের উত্তর প্রদেশে থাকেন। আজমগড় হাকিমের কার্যালয়ের নথিপত্রে তিনি মৃত। রামজনমের অভিযোগ, পৈতৃক সম্পত্তি দখল করতেই ভাই ঘুষ দিয়ে এ কাজ করেছেন। এ কারণেই কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বারবার তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকার করেন।

শুধু রামজনম নন, এমন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উত্তর প্রদেশের আরও অনেকে। সম্পত্তি দখল করতে আত্মীয়স্বজন এমনকি নিজের সন্তানকেও জমির মালিকদের সরকারি খাতায় মেরে ফেলছেন। কাগজপত্রে জীবিত হয়েও মানুষ হয়ে পড়ছেন মৃত।

ভারতের উত্তর প্রদেশ জনবহুল এলাকা। জমির তুলনায় সেখানে লোকসংখ্যা বেশি। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বেশি। সেখানেই এ ধরনের ঘটনা বেশি হচ্ছে।

৪০ বছর পর আজমগড়ের লালবিহারী জানতে পারেন তাঁর তিন একর জমি বেদখল হয়ে গেছে। তাঁরই এক আত্মীয় এটি দখল করে নিয়েছেন। স্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়েছেন তিনি। এতে সরকারি খাতায় লালবিহারী মৃত। তাই তাঁর জমির মালিক এখন অন্য ব্যক্তি। এরপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে লালবিহারীকে প্রমাণ করতে হয় তিনি মরেননি। বেঁচে আছেন—এটি প্রমাণ করতে এক কার্যালয় থেকে আরেক কার্যালয়ের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন। শেষ পর্যন্ত দ্বারস্থ হয়েছেন আদালতের। তবে প্রমাণ হয়েছে—তিনি মরেননি।

লালবিহারীর ভাষায়, ‘এভাবে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে এক সময় নিজের অস্তিত্ব নিয়েই টানাপোড়েন শুরু হয়। শত্রুরা আমাকে খুন করেনি ঠিকই, কিন্তু কোনো না কোনোভাবে আমাকে মেরে ফেলেছে। অস্তিত্বহীন করে ফেলেছে।’
ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড়ে সরকারি খাতায় মৃত রামজনম মৌরিয়া। জীবিত রয়েছেন এটা প্রমাণ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাঁদে পড়া এসব মানুষদের সহায়তা করছে মৃতক সিং নামে একটি সংগঠন। তাদের কাছে নিজের দুঃখের কথা বলছেন রামজনম। ছবি: এএফপি
এ রকম ফাঁদে আরও যারা পড়েছেন, তাঁদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন লালবিহারী। গড়ে তোলেন ‘মৃতক সিং’ নামে একটি সংগঠন। এ পর্যন্ত এ রকম ফাঁদে পড়া ২০০টি ঘটনায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন লালবিহারী।
এসব অভিযোগ মানতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। তাঁরা বলছে, লোকজন ভুয়া অভিযোগ তুলছে। আজমগড়ের ম্যাজিস্ট্রেট এল ওয়াই সুহাসের দাবি, প্রত্যেকের তথ্য ও দলিলপত্র কমপিউটারে রেকর্ড করা থাকে। কাজেই এসব নিয়ে জালিয়াতি করা অসম্ভব।

তাহলে এই অভিযুক্তরা কী মিথ্যে গল্প বলছেন? সুহাসের দাবি, প্রচার পাওয়ার জন্য অনেকে এমন করেন।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুহাস যাই বলুন না কেন, ভোগান্তির শেষ নেই রামজনম, লালবিহারী বা তাঁদের মতো আরও অনেকের। অনেকে জানতেই পারেন না কখন কীভাবে তাঁদের এ রকম ফাঁদে ফেলে দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালে বাবা মারা যাওয়ার সময় রমজানামকে এক হাজার ৫০০ স্কয়ার মিটার জমি দেন। ভাইকে জমিটি দেখাশোনার দায়িত্ব দেন তিনি। ২০১৩ সালে জমিটি ছেলের নামে করে দেওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু তখন জানতে পারেন, ওই জমি আর তাঁর নামে নেই। জমি তো দূরের কথা, তিনিই আর নেই। সরকারি খাতায় তিনি মারা গেছেন। এ অপকর্মটি করেছেন তাঁরই ভাই। জমি দখলে বোনকে কাগজকলমে মেরে ফেলেছেন তিনি।

৫২ বছরের বৃদ্ধ জগদীশ প্রসাদ গুপ্তর গল্প আরও করুণ। কখনো যে তিনি এই পৃথিবীতে ছিলেন, এটিই প্রমাণ করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। গুপ্তর একটি মিষ্টির দোকান রয়েছে। তিনি যে জন্ম নিয়েছিলেন, এরই কোনো প্রমাণ নেই। কারণ সরকারি খাতা বলছে, অনেক কম বয়সে তাঁর বাবা মারা গেছেন। তাই তাঁর বাবার আর কোনো সন্তান জন্ম নেওয়া অসম্ভব। সেই হিসেবে জগদীশ বা তাঁর সন্তানদেরও কোনো অস্তিত্ব নেই। তাঁদেরই এক আত্মীয় জমি দখলের জন্য বাবাকে এই ফাঁদে ফেলেন।

জমি নিয়ে এখন আর ভাবেন না গুপ্ত। তবে তাঁর চিন্তা নিজের ও সন্তানদের অস্তিত্ব নিয়ে। যেকোনো সময় তাঁরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়তে পারেন।

উত্তর প্রদেশের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সের সমাজতাত্ত্বিক মোহাম্মদ আরশাদ বলেন, জমি দখলের জন্যই মানুষকে এ রকম ফাঁদে ফেলা হয়। ভারতে নগরায়ণ বাড়ছে। আবাদি জমি দখল হয়ে যাচ্ছে। বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ। জমি কম আর জনসংখ্যা বেশি। তাই জমি দখলের জন্য কাড়াকাড়ি করছে মানুষ। জমি পেতে গিয়ে হিতাহিতজ্ঞান লোপ পাচ্ছে মানুষের। আর এরই মাশুল দিয়ে যাচ্ছেন রামজনম, লালবিহারী বা জগদীশরা।–সুত্র প্রথম আলে অনলাইন